ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিদ ইবনে রেজা কঠোর বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর যেকোনো যুদ্ধজাহাজকে কার্যকরভাবে নিশানা করতে এবং হামলা চালাতে ইরান সামরিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত ও সক্ষম।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় দুই বৈরী পরাশক্তির মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও নতুন করে অস্থির করে তুলেছে।
এর আগে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেহরানের সক্ষমতা নিয়ে সরাসরি সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করেন, ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে প্রতিরোধ করার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তি ইরানের নেই।
মার্কিন প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাগরে অবস্থানরত অত্যাধুনিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সজ্জিত আমেরিকান যুদ্ধজাহাজগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো হুমকি তৈরির মতো উন্নত রাডার বা দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানার অস্ত্রব্যবস্থা তেহরানের আয়ত্তে নেই।
মূলত মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক হুমকিকে খাটো করে দেখতেই এমন মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের মূল্যায়নকে সরাসরি ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়েছেন ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সত্যিই মার্কিন রণতরীগুলোর ওপর সফলভাবে আঘাত হানতে পারবে কি না।
এই প্রশ্নের সরাসরি জবাবে জেনারেল মজিদ ইবনে রেজা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেন যে, এই জাতীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম ইরানের সামরিক বাহিনীর কাছে বিদ্যমান রয়েছে।
তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, ইরান কেবল প্রতিরক্ষাই নয়, বরং যেকোনো আগ্রাসনের মুখে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে সর্বাত্মক আঘাত হানার পূর্ণ সামর্থ্য সংরক্ষণ করে। নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিদ ইবনে রেজা ওয়াশিংটনকে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।
তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববাসী নিজেই এর ফলাফল ও পরিণতি দেখতে পাবে। তার মতে, মার্কিন প্রশাসন যেন নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় কোনো ভুল হিসাব-নিকাশ না করে।
ইরান যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে বাস্তব কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করে দেবে যে তারা শত্রুর যেকোনো উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন নৌবহর প্রতিহত করতে কতটা প্রস্তুত। তার এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকান সামরিক নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক সুস্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য মূলত তাদের নিজস্ব প্রতিরোধমূলক সামরিক কৌশলেরই অংশ। হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ রুটে মার্কিন নৌবাহিনীর বিপুল উপস্থিতি তেহরান সর্বদাই নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে, প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে চলার নীতি বজায় রাখলেও ইরান গত কয়েক দশকে নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তিতে জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন বহর এবং দ্রুতগতির আক্রমণকারী গানবোটের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধরনের কৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় জলসীমায় এই ধরনের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের মোট খনিজ তেল সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সংকীর্ণ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। সেখানে কোনো পক্ষ থেকে সামান্যতম ভুল বোঝাবুঝি বা সামরিক উসকানি দেখা দিলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতেই চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত এড়াতে এবং এই স্পর্শকাতর অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে উভয় পরাশক্তিকেই সর্বোচ্চ সংযম ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে।