সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন আগ্রাসনের কাছে মাথা নত করবে না ইরান, ঐক্যের ডাক প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম

মার্কিন আগ্রাসনের কাছে মাথা নত করবে না ইরান, ঐক্যের ডাক প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে কোনোভাবেই নতি স্বীকার করবে না মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তি ইরান। চলমান এই চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে দেশের সরকার ও জনগণকে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, যদি দেশের ভেতরে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি অটুট রাখা যায়, তবে বহির্বিশ্বের প্ররোচনায় অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টির যেকোনো ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই বার্তা মূলত পশ্চিমাদের প্রতি একটি স্পষ্ট সংকেত যে, চাপের মুখে ইরান তার অবস্থান থেকে একচুলও সরবে না।

 

গত মাসে মার্কিন প্রশাসন তেহরানের বিরুদ্ধে 'ইকোনমিক ডি-ডে' বা চূড়ান্ত অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের দাবি অনুযায়ী, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সবচেয়ে কঠোর ও ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।

 

এই আগ্রাসী পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ইরান সরকার এবং দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) টিকে থাকার সব ধরনের অর্থনৈতিক উৎস ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের পথ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।

 

তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ ধরনের একপাক্ষিক, বেআইনি ও আগ্রাসী চাপের কারণে তেহরান তার রাষ্ট্রীয় কৌশল বা পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিই এই ধরনের বাহ্যিক চাপ মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।

 

একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, শত্রুদের এই কঠোর পদক্ষেপ দেশের ভেতরে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করার একটি সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত হতে পারে।

 

গত শুক্রবার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ও নির্দেশনামূলক ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ এবং একের পর এক নিষেধাজ্ঞার ফাঁদ তৈরি করে শত্রুপক্ষ মূলত দেশের ভেতরে বিভেদ, ফাটল ও চরম অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে।

 

এই প্রসঙ্গে তাঁর সতর্কতামূলক বক্তব্যে ২০১৯ ও ২০২০ সালের দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্মৃতিও উঠে আসে। সে সময় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম আকস্মিকভাবে বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক বিশাল ও সহিংস সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল।

 

সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই সরকার এবার আগেভাগে জনগণকে সতর্ক করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। চলতি সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক আবেগপূর্ণ ভাষণে পেজেশকিয়ান সাধারণ মানুষের বর্তমান জীবনযাপনের দুর্দশা ও অর্থনৈতিক সংকটের কথা অকপটে স্বীকার করে নেন।

 

তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল সুরে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই চরম অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। এই অবস্থায় তাদের ওপর যদি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন করে আরও বেশি চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তারা হয়তো নিজেদের সহ্যসীমা অতিক্রম করে ফেলবে।

 

এতদসত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চরম বাস্তবতার নিরিখে জ্বালানি নীতিতে বেশ কিছু রদবদল আনার কঠিন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্ধারিত তিন স্তরের পেট্রল কোটার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্তরের দাম আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দ্বিগুণ করা হবে।

 

এর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের জন্য মাসিক পেট্রল বরাদ্দের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। উল্লেখ্য, শক্তিধর তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন সংকট বিরাজ করছে।

 

বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে জ্বালানি পাচার, দীর্ঘদিনের অবহেলায় তেল ও গ্যাস উত্তোলনের পুরোনো অবকাঠামোর চরম ক্ষয়ক্ষতি এবং অধিক জ্বালানি খরচ করা অত্যন্ত নিম্নমানের যানবাহনের আধিক্যই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রধান কারণ।

 

পেট্রলের দাম নতুন করে আরও এক দফা বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই সারা দেশে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে। এর প্রত্যক্ষ ও তাত্ক্ষণিক প্রভাব পড়বে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর, যা আগে থেকেই ইরানের প্রায় প্রতিটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝার সৃষ্টি করে রেখেছে।

 

এদিকে, এই ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিষেধাজ্ঞার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের মুদ্রাবাজারের ওপর। শনিবার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রাজধানী তেহরানের শেয়ার ও মুদ্রাবাজার খুলতেই ইরানি মুদ্রার মান ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

 

অর্থনৈতিক খাতের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে বাইশ লাখ পঞ্চাশ হাজার। মুদ্রার এই চরম অবমূল্যায়ন দেশের সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রা নিয়ে গভীর শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে, যা মোকাবিলা করাই এখন পেজেশকিয়ান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।