আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের এক বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই স্পর্শকাতর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ‘খাতামুল আম্বিয়া’ ঘাঁটির কেন্দ্রীয় সদর দফতরের পক্ষ থেকে এই কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও সামরিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
খাতামুল আম্বিয়া ঘাঁটির কেন্দ্রীয় সদর দফতরের শীর্ষ মুখপাত্র কর্নেল ইব্রাহিম জুলফিকারি শনিবার রাতে এক বিশেষ ঘোষণায় এই চরম হুঁশিয়ারি প্রদান করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কৌশলগত নৌ পদক্ষেপগুলোকে অত্যন্ত উসকানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কর্নেল জুলফিকারি তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন, শত্রুপক্ষ যদি তাদের বিদ্বেষপূর্ণ ও শয়তানি কর্মকাণ্ড থেকে সরে না আসে এবং আঞ্চলিক জলসীমায় ইচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি ও হয়রানিমূলক আচরণ অব্যাহত রাখে, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আর নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না।
তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান নৌ অবরোধ যদি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা না হয়, তবে এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক নৌবহর ও জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও অনেক বেশি ভয়ংকর, ধ্বংসাত্মক এবং বিস্তৃত হবে।
তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, তেহরান এখন তাদের জলসীমা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষায় যেকোনো চরম সামরিক পদক্ষেপ নিতেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই উত্তেজনার পারদ যেন এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান উপসাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং টহলকে ইরান সবসময়ই তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি ও সুস্পষ্ট হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ ও নৌ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই তারা ওই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
কিন্তু তেহরানের অভিযোগ, স্বাধীন নৌ চলাচলের খোঁড়া অজুহাতে ওয়াশিংটন মূলত ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি জাহাজগুলোর স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচলে ইচ্ছাকৃতভাবে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
খাতামুল আম্বিয়া ঘাঁটির এই বিবৃতিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন শীর্ষ সামরিক বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই সদর দফতরটি মূলত ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখার-যথা নিয়মিত সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং নৌবাহিনীর-যৌথ অভিযানের সর্বোচ্চ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
ফলে এখান থেকে আসা যেকোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অর্থ হলো, এটি ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্মিলিত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কর্নেল ইব্রাহিম জুলফিকারির এই বক্তব্য মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি একটি সরাসরি সামরিক আল্টিমেটাম হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ও নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের এমন প্রকাশ্য কড়া বার্তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক নতুন অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, এই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে সামান্যতম ভুল বোঝাবুঝি বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ যেকোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
আর যদি এমন কোনো সংঘাতের সূচনা হয়, তবে তার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে, উভয় পক্ষেরই উচিত বর্তমান উত্তেজনা প্রশমনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংযম প্রদর্শন করা এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিরাজমান বিরোধের যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা।
অন্যথায়, সাগরের বুকে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘাত পুরো বিশ্বকেই এক চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তেহরানের এই সর্বশেষ সতর্কবার্তার পর এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার দিকে।
দেখার বিষয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ কৌশলগত অবস্থানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনে কি না, নাকি তারা তাদের পূর্ববর্তী অনড় ও আগ্রাসী অবস্থানেই স্থির থেকে নতুন কোনো সংঘাতের উসকানি দেয়।