শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরাইলের নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের চরমপন্থি নীতি, তাকে থামাবে কে?

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

ইসরাইলের নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের চরমপন্থি নীতি, তাকে থামাবে কে?
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ফিলিস্তিন সংকটের কেন্দ্রে এখন অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত নাম ইতামার বেন-গভির। তিনি বর্তমানে ইসরাইল সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন অত্যন্ত বিতর্কিত, কট্টরপন্থি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ইসরাইলের পুলিশ বাহিনী, সীমান্তরক্ষী এবং গোটা কারা ব্যবস্থার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ এখন সরাসরি তার হাতে ন্যস্ত রয়েছে।

 

এই বিপুল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তিনি ঠিক কীভাবে এবং কোন ভয়ংকর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চান, তা তিনি তার সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ, প্রকাশ্য ঘোষণা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

 

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি ইসরাইলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর আরও কঠোর, অমানবিক ও নিপীড়নমূলক বিধিনিষেধ আরোপের ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষেও তিনি অত্যন্ত জোরালো ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

রাজনীতিতে তার উত্থান এবং বর্তমান কর্মকাণ্ড গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অন্যকে অপমান করা, অবজ্ঞা করা এবং হেয়প্রতিপন্ন করা তার রাজনৈতিক দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তার এই উসকানিমূলক আচরণের বহু অকাট্য প্রমাণ ইতিমধ্যে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি অমানবিক অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করতে গিয়ে আটক হওয়া সাধারণ কর্মী ও মানবাধিকার রক্ষাকারীদের তিনি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে উপহাস করছেন।

 

একজন শীর্ষস্থানীয় সরকারি মন্ত্রীর এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতি ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশ্বের খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কিন্তু বেন-গভির এসব বৈশ্বিক সমালোচনা ও নিন্দাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে তার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন।

 

তবে বেন-গভিরের এই চরমপন্থি চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড কেবল ইসরাইলি কারাগারের চার দেয়ালের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সমগ্র ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এক ভয়াবহ ও সীমাহীন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।

 

গাজা উপত্যকায় চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সামনে প্রতি রাতে অন্তত ত্রিশ থেকে চল্লিশ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার জন্য ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

 

তার এই ভয়ংকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর ঠেকেছে। এর পাশাপাশি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের যে ধারাবাহিক, সশস্ত্র ও বর্বরোচিত সহিংস হামলা চলছে, তাতেও তিনি প্রকাশ্য ইন্ধন, আইনি সুরক্ষা ও উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছেন।

 

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের অসংখ্য প্রস্তাবকে সম্পূর্ণভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরাইলি বসতি দ্রুত সম্প্রসারণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি গাজা উপত্যকা থেকে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করে সেখানে পুনরায় ইসরাইলি সামরিক ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো চরম অমানবিক প্রস্তাবেরও তিনি ঘোর সমর্থক।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বেন-গভিরের এসব উসকানিমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ ও আগ্রাসী বক্তব্যের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষকে চমকে দেওয়া, ফিলিস্তিনিদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা এবং নিজ দলের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠীকে সর্বদা উজ্জীবিত রাখা।

 

কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এর চেয়েও বড় ও ভয়ংকর বিপদ সম্ভবত তখনই তৈরি হয়, যখন তার এসব চরমপন্থি বক্তব্য আর কাউকে বিস্মিত করে না, বরং এগুলোকে ইসরাইলি রাজনীতির স্বাভাবিক দৈনন্দিন ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়।

 

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বেন-গভির একসময় ইসরাইলের মূলধারার রাজনীতির জন্য এতটাই কট্টরপন্থি, উগ্র ও বিষাক্ত বলে বিবেচিত হতেন যে, কোনো নির্বাচিত সরকারেই তার স্থান হতো না। এমনকি সেনাবাহিনীতেও তাকে চরমপন্থি হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

 

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণে সেই প্রান্তিক ও উগ্র রাজনীতিক আজ দেশটির অন্যতম ক্ষমতাধর ও নীতি-নির্ধারক ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন, যিনি লাখ লাখ ফিলিস্তিনির জীবনের ওপর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।

 

বর্তমানের এই অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেন-গভির প্রতিনিয়ত একের পর এক রাজনৈতিক, আইনি, নৈতিক ও মানবিক সীমারেখা চরমভাবে অতিক্রম করে চলেছেন। তার এই আগ্রাসী ও আপসহীন নীতি কেবল ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারের জন্যই নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোও তার এই লাগামহীন আচরণের তীব্র সমালোচনা করছে। তবে ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের টিকে থাকার বাধ্যবাধকতার কারণে তাকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বা ক্ষমতাচ্যুত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আর এটি নয় যে বেন-গভির ঠিক কতদূর পর্যন্ত যেতে চান বা তার ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার শেষ কোথায়।

 

বরং এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, গভীর ও ভয়ংকর উদ্বেগের প্রশ্নটি হলো-তার আশপাশের রাজনৈতিক মিত্ররা, ইসরাইলের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সর্বোপরি নীরব দর্শক হয়ে থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাকে ঠিক কতদূর পর্যন্ত এই চরমপন্থি নীতি বাস্তবায়ন করতে দিতে প্রস্তুত?

 

- আরএনএস