বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়টিকে তারা নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের প্রধান সুযোগ হিসেবে বেছে নেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক বৈরিতার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এমন আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন।
তার এই বিশ্লেষণাত্মক পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ইরানের অতীতের কৌশলগত পদক্ষেপগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে জোয়ে হুড উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে তেহরানের।
তিনি জানান, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ইরান অতীতে বারবার এই ধরনের রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সময় সংঘটিত ঐতিহাসিক জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের প্রায় প্রতিটি প্রেসিডেন্টের কার্যকালেই কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী চাপের মুখে ফেলার এই পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে।
জোয়ে হুডের মতে, অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে দৃষ্টি সরানো কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির সক্ষমতা তুলে ধরতে এই ধরনের সংকটময় মুহূর্তগুলোকে ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে আসছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জটিলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই সাবেক কূটনীতিক তুলে ধরেন যে, আগামী নভেম্বর মাসে একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সময়কালটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। হুড মনে করেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে এটি তেহরানের জন্য একটি মোক্ষম ও বিরাট সুযোগ এনে দিতে পারে।
মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত বাস্তব দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটাররা পেট্রোল তথা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে ভীষণভাবে স্পর্শকাতর। তিনি বিষয়টিকে আরব সমাজের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষ যেমন রুটির দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূমিকা পালন করেন, ঠিক তেমনি মার্কিন ভোটারদের মনোভাব ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সুতরাং নির্বাচনের আগমুহূর্তে তেলের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলার মতো কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রশাসনের জন্য মারাত্মক রাজনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কের অচলাবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জোয়ে হুড গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বা কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা ও যোগাযোগ নেই।
সরাসরি যোগাযোগের এই চরম অনুপস্থিতির ফলে দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক অচলাবস্থা ক্রমশ এক বিপজ্জনক রূপ ধারণ করছে। তিনি সতর্ক করেন, প্রচলিত কূটনৈতিক উপায়ে এই জটিল সংকটের সহজ সমাধান খুঁজে পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।
অচলাবস্থা কাটিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে হলে মধ্যস্থতাকারী কোনো পক্ষকে সম্পূর্ণ নতুন, উদ্ভাবনী ও চমকপ্রদ কোনো কূটনৈতিক রূপরেখা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। জোয়ে হুডের সুস্পষ্ট অভিমত, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যদি কোনো ব্যতিক্রমী প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ কূটনৈতিক তৎপরতা আসলে কোনো বাস্তব ফল বয়ে আনতে পারবে না।
এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে একটি সম্ভাব্য বিকল্প পথের রূপরেখাও তুলে ধরেন এই সাবেক মার্কিন কূটনীতিক। তিনি মনে করেন, বিশেষ করে ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তিতে’ স্বাক্ষরকারী আঞ্চলিক দেশগুলো যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এগিয়ে আসে, তবে হয়তো একটি টেকসই সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে।
এ ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব পেশ করে তিনি বলেন, মক্কা চুক্তির অংশীদার দেশগুলো যদি তাদের নিজস্ব নৌবহর নিয়ে পারস্য উপসাগর এবং উত্তর আরব সাগরে কার্যকর অবস্থান নেয়, তবে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হতে পারে।
এই দেশগুলো যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে দায়িত্ব গ্রহণ করে যে তারা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে নিয়মিত নজরদারি চালাবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর আর কোনো হামলা হতে দেওয়া হবে না, তবে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক বা নৌ-অবরোধের প্রয়োজন পড়বে না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এই ধরনের সম্মিলিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ দীর্ঘদিনের এই বৈরিতা প্রশমনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা এবং জ্বালানি পরিবহন রুটে যেকোনো ধরনের সামরিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মারাত্মক অভিঘাত ডেকে আনতে পারে।
জোয়ে হুডের এই দূরদর্শী সতর্কবার্তা ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক মহলে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের রাজনীতি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত নিরাপত্তা-এই দুইয়ের কঠিন ভারসাম্যে আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চরম পরীক্ষার সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।