শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ছবি: Collected

মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর এবার এই সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সামরিক অভিযানের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধ সমাপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ উচ্চপদস্থ সহযোগীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

মার্কিন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে-এমন একটি রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন।

 

তাঁর ধারণা, সামরিক সংঘাত আর না বাড়িয়ে বরং অব্যাহত কঠোর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখলেই ইরান শেষ পর্যন্ত নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে বাধ্য হবে অথবা দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বড় ধরনের পতন ঘটবে।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের বিরুদ্ধে চলমান চাপ প্রয়োগ অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১৯ আগস্ট দেশটির বিরুদ্ধে নতুন ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা নীতি কার্যকর করার ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।

 

সে সময় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেন যে, এই সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের অবশিষ্ট সমস্ত অর্থনৈতিক পথ রুদ্ধ করে দিয়ে দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।

 

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক কৌশল। তাঁদের মতে, দীর্ঘ ছয় মাসের সামরিক অভিযানের পরও রণক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর সম্মানজনকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার পথ সুগম করতেই মূলত নিষেধাজ্ঞার এই বিকল্প কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছে।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ সংঘাতের শুরুতে এই অভিযানকে দ্রুত ও চূড়ান্ত ফলদায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, যাতে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে না হয়।

 

এদিকে মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ট্রাম্পের এমন ভাবনা ও হিসাব-নিকাশের পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির বিজয়ের সম্ভাবনা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনা করে প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা তাঁকে বড় ধরনের নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার জোর পরামর্শ দিয়েছেন।

 

অথচ এর আগে গত মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভিযানের পরিধি বাড়ানোর বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত সামরিক বিকল্প সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ইরানি ভূখণ্ডে বিমান হামলার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী ইরানি দ্বীপগুলো দখলের উদ্দেশ্যে মার্কিন স্থলবাহিনী মোতায়েন এবং কারকাস পর্বতমালা এলাকায় সম্ভাব্য বড় ধরনের আঘাত হানা।

 

কিন্তু ওয়াশিংটনের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে দেন যে, এ ধরনের আগ্রাসী অভিযান পরিচালনা করতে গেলে পুরো অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিপুল পরিমাণ মার্কিন সমরাস্ত্র ও সৈন্য মোতায়েন রাখতে হবে, যার ফলে অভিযানের মেয়াদ আশঙ্কাজনকভাবে দীর্ঘায়িত হবে।

 

প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ক্লান্তির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দায়িত্বে নিয়োজিত মার্কিন সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোর স্বাভাবিক নয় মাসের মোতায়েনের মেয়াদ ইতোমধ্যে বাড়িয়ে ১২ মাস করা হয়েছে।

 

এমনকি ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য মূলত নির্ধারিত কিছু সামরিক ইউনিটকেও এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করতে বাধ্য করা হচ্ছে। স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর মিসাইল ডিফেন্স প্রকল্পের পরিচালক টম কারাকো এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

তিনি জানান, এই যুদ্ধ শুরুর আগেও মার্কিন যৌথ বাহিনীর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের কাজের চাপ ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই অতিরিক্ত মোতায়েন অব্যাহত রাখলে সেনাসদস্যদের ওপর অপূরণীয় মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি হবে, যার ফলে সামরিক সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হবে এবং ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে।

 

সেনাবাহিনীর পাশাপাশি মার্কিন নৌবাহিনীও বর্তমানে একই ধরনের চরম সংকটের মুখোমুখি রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং ১৩টি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ মোট ১৯টি যুদ্ধজাহাজ নিয়োজিত রয়েছে।

 

যুদ্ধের প্রারম্ভে মোতায়েন করা বেশ কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার কোনো স্বাভাবিক বিরতি বা বিশ্রাম ছাড়াই মাসের পর মাস উত্তাল সাগরে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছে। কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘস্থায়ী মোতায়েনের নজির আর দেখা যায়নি।

 

মার্কিন বিমানবাহী সর্বাধুনিক রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’ টানা ১১ মাস সমুদ্রে দায়িত্ব পালন শেষে গত মে মাসে দেশে ফিরেছে, যা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কোনো মার্কিন রণতরীর দীর্ঘতম অবস্থানের ঐতিহাসিক রেকর্ড।

 

একইভাবে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ দীর্ঘ মিশন শেষে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও দীর্ঘতর একটি অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে এই অঞ্চলে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

 

টানা এমন সামরিক উপস্থিতির কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর সামগ্রিক রসদ সরবরাহ বা লজিস্টিক ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান সংকট দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দূরবর্তী সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে।

 

ফলে যুদ্ধজাহাজের নাবিকদের কাছে সাধারণ ডাক পৌঁছানো এবং পরিবারের পাঠানো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে নাবিকদের জন্য যুদ্ধজাহাজের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগও অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ এভাবে চলতে থাকলে তা সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধজাহাজের বড় ধরনের অবচয় ঘটাবে এবং সামগ্রিক সামরিক পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেবে, যা থেকে রক্ষা পেতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুদ্ধের সমাপ্তি টানার পথ খুঁজছেন।

 

- পার্সটুডে