আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে শত্রুর সমরাস্ত্র এবং রণকৌশল সম্পর্কে এমন গোপন ও সুনির্দিষ্ট তথ্য হাতে পাওয়া যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বিশাল কৌশলগত বিজয়।
এই যুগান্তকারী অর্জন ইরানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানী তেহরানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডার এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে অংশ নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বৈঠকে তিনি দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় নিয়োজিত প্রতিটি বাহিনীর অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানের জাতীয় সেনাবাহিনী, অভিজাত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং পুলিশ বাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্য যে অপরিসীম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা স্বাধীন ইরানের প্রতিরক্ষার ইতিহাসে একটি চিরঞ্জীব ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মাতৃভূমি সুরক্ষায় এই তিন বাহিনীর সম্মিলিত ও সুসমন্বিত প্রচেষ্টাই মূলত শত্রুর যেকোনো গভীর ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার মূল চালিকাশক্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জেনারেল ইবনুর রেজা বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের সার্বিক পরিস্থিতি এবং শত্রুর রণকৌশল নিয়ে ইরানের সামরিক বিশেষজ্ঞদের পরিচালিত নিবিড় গবেষণা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
আর তা হলো, শত্রুপক্ষ তাদের সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র এবং সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক এক অঘোষিত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করা।
কিন্তু কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, শত্রুর এই আগ্রাসী পদক্ষেপ প্রকারান্তে ইরানের জন্যই শাপে বর হয়েছে। এই অসম যুদ্ধ পরিস্থিতি ইরানের সামরিক বাহিনীর জন্য এক অভাবনীয় প্রযুক্তিগত অর্জন এবং ভবিষ্যতের জন্য এক অমূল্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা তাদের নিজস্ব সমরাস্ত্র উন্নয়নের পথকে আরও প্রশস্ত করেছে।
বিদেশি শক্তির এই প্রবল প্রযুক্তিগত আগ্রাসন ইরান কীভাবে প্রতিহত করেছে, তার একটি বিশদ ব্যাখ্যাও দেন ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বিদেশি কোনো পরাশক্তির মুখাপেক্ষী না হয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প, নিজস্ব বিজ্ঞানী, দেশের মেধাবী সন্তান, তরুণ প্রকৌশলী এবং একান্তই অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ইরান অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে শত্রুর এই উন্নত প্রযুক্তির মোকাবিলা করেছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক মহলের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান সামরিক দিক থেকে অনেকটাই স্বনির্ভর হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিল, আর আজকের এই সফলতা মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী নীতিরই চূড়ান্ত ফসল। দেশের মেধাবী তরুণ সমাজ এবং বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইরানের প্রতিরক্ষা খাত আজ এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইরানের এই দেশীয় সমরাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি, রাডার ব্যবস্থা এবং সাইবার প্রতিরক্ষা খাতে ইরানের সাম্প্রতিক অগ্রগতি পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনারেল ইবনুর রেজার এই বক্তব্য মূলত সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন, যেখানে তারা বোঝাতে চাইছেন যে, বাইরের কোনো প্রযুক্তিগত আগ্রাসন বা হুমকি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আর পরাস্ত করতে পারবে না।
বক্তব্যের উপসংহারে জেনারেল ইবনুর রেজা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ পরিস্থিতি সারা বিশ্বের সামনে একটি অকাট্য সত্য প্রমাণ করেছে। তা হলো, দশকের পর দশক ধরে চলা পশ্চিমা বিশ্বের সীমাহীন অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানামুখী প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে দাঁড়িয়েও শুধু নিজস্ব সক্ষমতা ও দেশীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামরিক শক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব।
শুধু মোকাবিলা করাই নয়, বরং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে সেই অসম লড়াইয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করাও যে পুরোপুরি সম্ভব, ইরান তা বিশ্ববাসীকে হাতে-কলমে প্রমাণ করে দেখিয়েছে। সামরিক স্বনির্ভরতার এই মডেল আন্তর্জাতিক সামরিক ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।