মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারির ক্ষমতা এতই তীক্ষ্ণ ও নিখুঁত যে, তাদের দৃষ্টির অগোচরে ইরানি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে শৌচাগারেও যেতে পারেন না বলে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অপ্রতিরোধ্য গোয়েন্দা সক্ষমতার বিষয়টিই সামনে আনতে চেয়েছেন। স্থানীয় সময় বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসভবন হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং সামরিক আধিপত্যের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ট্রাম্প জানান, মার্কিন গোয়েন্দারা সার্বক্ষণিকভাবে ইরানের সমস্ত কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
তাদের এই নজরদারি ব্যবস্থা এতটাই আধুনিক ও সুদূরপ্রসারী যে, ইরানের অভ্যন্তরে যেকোনো নতুন সামরিক প্রস্তুতি বা অস্ত্র তৈরির খবর মুহূর্তের মধ্যেই ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই উন্নত প্রযুক্তির কারণেই ইরান চাইলেও কোনো গোপন সামরিক প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারছে না বলে তিনি দাবি করেন।
ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক কার্যকলাপ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি অভিনব সমরাস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ইরান গত কয়েকদিন ধরে সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির একটি রকেট তৈরির কাজ চালিয়ে আসছিল।
এই বিশেষায়িত রকেটটি মূলত সমুদ্রের তলদেশে মাইন স্থাপনের কাজে ব্যবহারের জন্য নকশা করা হয়েছিল। ইরানের এই গোপন সামরিক কৌশল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ধরে ফেলার মার্কিন সক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়েই ট্রাম্প উপহাসের সুরে ওই মন্তব্যটি করেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে এক পা-ও অগ্রসর হতে সক্ষম নয়। তাদের প্রতিটি নড়াচড়াই মার্কিন স্যাটেলাইট ও রাডারে ধরা পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও ট্রাম্প বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সম্প্রতি ইরানের ওপর অত্যন্ত শক্তিশালী ও সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। এর ফলে বর্তমানে পুরো হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে মার্কিন বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলবাহী অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজ অত্যন্ত নিরাপদে পারাপার করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পাহারার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাহাজগুলো কোনো ধরনের বাধা বা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে না।
বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে ওয়াশিংটন নিজেদের অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে দেখছে। তবে ইরান যে এই জলপথে বসে নেই, সেটিও উঠে এসেছে ট্রাম্পের বক্তব্যে। তিনি জানান, ইরানি বাহিনী প্রায়ই মার্কিন অবস্থানের ওপর নজরদারি বা হামলার উদ্দেশ্যে চালকবিহীন আকাশযান প্রেরণ করে থাকে।
কিন্তু মার্কিন নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেগুলোকে চিহ্নিত করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ভূপাতিত করে তাদের যেকোনো অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং শক্তিশালী বলে তিনি পুনরুল্লেখ করেন।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের কারণেই ইরান ওই অঞ্চলে স্বাধীনভাবে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান, ইরান সম্প্রতি তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাডার ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামো নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।
একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালির কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে মাইন পুঁতে রাখারও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, যাতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু মার্কিন বাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট হামলায় ইরানের সেই সমস্ত নতুন সমরাস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, যেগুলো তারা ওই প্রণালির কাছাকাছি অঞ্চলে মজুত করতে চেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আগাম হামলার ফলে ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান আগে যে সমস্ত মাইন স্থাপন করেছিল, মার্কিন নৌবাহিনী ইতিমধ্যে তার সবকিছু সফলভাবে অপসারণ করেছে।
এরপরই ইরান এমন একটি রকেট তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়, যা দূর থেকেই সমুদ্রে মাইন ফেলতে সক্ষম। ট্রাম্প বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেন, সমুদ্রে মাইন ফেলতে পারে এমন রকেটের কথা এর আগে কেউ কখনো শোনেনি। কিন্তু ইরান ঠিক এমনই একটি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল।
যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিটি কাজ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখতে পায়, তাই অস্ত্রটি পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কিছু সন্দেহভাজন বস্তুকেও মার্কিন বাহিনী গুড়িয়ে দিয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
পরিশেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইরানের যেকোনো গোপন সামরিক প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের চোখের সামনে আয়নার মতো পরিষ্কার। মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর সতর্কবার্তা এবং সামরিক পদক্ষেপের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা যে আপাতত থমকে গেছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও স্বীকার করছেন। এই ঘটনা বিশ্ব দরবারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি নতুন করে প্রমাণ করেছে।