শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে ইসরায়েলের সব সংস্থা একযোগে কাজ করছে: নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে ইসরায়েলের সব সংস্থা একযোগে কাজ করছে: নেতানিয়াহু
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উৎখাত এবং পরাস্ত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে তার দেশের প্রতিটি সরকারি ও গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

 

বুধবার, ৩রা সেপ্টেম্বর, ইসরায়েলের জাতীয় টেলিভিশন ‘চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর নিউজ’-কে দেওয়া এক বিশেষ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং ওই অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সংঘাতপূর্ণ করে তুলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তার সরকারের বর্তমান কৌশলগত অবস্থানের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “আমার সরাসরি ও ব্যক্তিগত নির্দেশনায় আমাদের সামরিক, নিরাপত্তা এবং সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি স্তর এই শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত ও পরাজিত করার অভিন্ন লক্ষ্যে অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।”

 

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত তেহরানের প্রতি তেল আবিবের চরম আগ্রাসী নীতির বিষয়টিকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আবারও অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রকাশ্যে এমন প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনার কথা স্বীকার করার ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বড় ধরনের আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

 

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার বৈরিতা দীর্ঘদিনের এবং এটি আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। উভয় দেশই একে অপরকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

 

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ফিলিস্তিনের হামাসের মতো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

 

অন্যদিকে, ইরানও বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। এমন এক চরম উত্তেজনাকর ও সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য ঘোষণা দুদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের চলমান ছায়াযুদ্ধকে একটি সরাসরি ও সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই সরাসরি মন্তব্য কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, বরং এটি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত।

 

ইরানের বিরুদ্ধে এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণের দিনটিতেই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাসদস্যদের একটি বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রমে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চলে সেনাছাউনিগুলো ঘুরে দেখে তিনি সেখানে নিয়োজিত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সার্বিক প্রস্তুতি, মানসিক মনোবল এবং চলমান সামরিক অভিযানের হালনাগাদ অগ্রগতি সম্পর্কে সরাসরি খোঁজখবর নেন।

 

সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী সেনাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপকালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাদের সাহসিকতা ও রণকৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সামরিক বাহিনীর সার্বিক কার্যক্রমে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

তিনি সেনাদের অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আশ্বস্ত করেন যে, তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একেবারে অপরিহার্য। সেনাসদস্যদের সঙ্গে তার এই কথোপকথন মূলত ইসরায়েলি বাহিনীর ভেতরের আত্মবিশ্বাস ও ঐক্য অটুট রাখার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

গাজা উপত্যকা পরিদর্শনকালে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি ওই ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বর্তমান নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) একক ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

 

দীর্ঘ সময় ধরে চলা তীব্র সংঘাত, নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক মহলের অব্যাহত যুদ্ধবিরতির আহ্বানের মাঝেই তার এই দাবি ইসরায়েলের অনমনীয় সামরিক অবস্থানের বিষয়টিকেই পুনরায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

ফিলিস্তিনিদের চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও ইসরায়েল যে নিজেদের ভূ-কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে কোনো ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য তারই অকাট্য প্রমাণ বহন করে।

 

গাজার বিশাল অংশ নিজেদের দখলে রাখার এই দাবি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনা চলছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক স্বনামধন্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর এই সাক্ষাৎকার এবং গাজা পরিদর্শনের সংবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, একদিকে ইরানের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক পরাশক্তিকে উৎখাতের সরাসরি হুমকি এবং অন্যদিকে গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই গর্বিত ঘোষণা-সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি অস্থিতিশীল, ধ্বংসাত্মক ও সংঘাতময় হয়ে ওঠার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কোনোভাবেই সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।

 

- মিডল ইস্ট আই