শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা চীন ও রাশিয়ার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা চীন ও রাশিয়ার
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এবার অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে বিশ্বের অন্যতম দুই পরাশক্তি চীন এবং রাশিয়া। ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করে বেইজিং এবং মস্কো ওয়াশিংটনকে তাদের এই ভ্রান্ত নীতি থেকে সরে আসার জোর আহ্বান জানিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন আধিপত্য এবং একতরফা নীতির বিরুদ্ধে দেশ দুটির এই শক্ত অবস্থান বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা চাপের মুখে ইরান, চীন এবং রাশিয়ার মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্ব ও ঐক্য আরও বেশি সুসংহত হচ্ছে।

 

স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে এমন স্পষ্ট মেরুকরণ অত্যন্ত বিরল, যেখানে মার্কিন নীতির বিরোধিতায় একাধিক বৃহৎ পরাশক্তি একই সুরে কথা বলছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র আপত্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

 

একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনের এই ধরনের একতরফা ও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপে বেইজিং গভীরভাবে দুঃখিত এবং তারা এর তীব্র বিরোধিতা করছে।

 

ইরান-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে চীনা কোম্পানি ও ব্যক্তিবর্গের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেছে চীন।

 

মুখপাত্র ওয়াশিংটনের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন অবিলম্বে তাদের এই ধরনের ভুল ও আগ্রাসী নীতি সংশোধন করে। সেই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের ওপর থেকে সমস্ত বেআইনি নিষেধাজ্ঞা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করারও জোর দাবি জানানো হয়েছে।

 

বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই মর্মে সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, চীন তার নিজস্ব কোম্পানি এবং সাধারণ নাগরিকদের বৈধ অধিকার ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষায় যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পিছপা হবে না এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তা মোকাবিলা করবে।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন হস্তক্ষেপ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে বলেও চীনের পক্ষ থেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু ও অব্যাহত নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে ইরানের সঙ্গে নিজেদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও নিবিড় করার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া।

 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ক্রেমলিনের শীর্ষ মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইরানের সঙ্গে সব ধরনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার বিষয়ে মস্কোর অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে পেসকভ বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার নিজস্ব বিশ্বস্ত অংশীদার এবং অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র রয়েছে।

 

এসব বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে রাশিয়া তার বহুমাত্রিক বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অংশীদারত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতেও বজায় রাখবে। শুধু তাই নয়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে মস্কো তার মিত্রদের সঙ্গে এই সম্পর্ককে আগামী দিনে আরও শক্তিশালী ও জোরদার করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

দিমিত্রি পেসকভের এই বক্তব্য মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা যে, কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ মস্কো ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র যখনই কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে, তখনই চীন ও রাশিয়া সেই দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে একটি বিকল্প বলয় তৈরির চেষ্টা করে।

 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের নীতির বিপরীতে গিয়ে বেইজিং ও মস্কো মূলত তেহরানকে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা বলয় প্রদান করছে।

 

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো একক দেশের ওপর এ ধরনের একতরফা ও আধিপত্যবাদী নিষেধাজ্ঞা আরোপকে চীন ও রাশিয়া সবসময়ই অবৈধ ও বেআইনি বলে মনে করে।

 

তাদের মতে, মার্কিন এই পদক্ষেপ কেবল ইরানের অর্থনীতিকেই লক্ষ্যবস্তু করছে না, বরং তা আন্তর্জাতিক অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের শামিল।

 

সংকটের মুহূর্তে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে চীন এবং রাশিয়ার এই সম্মিলিত প্রতিবাদ ও সমর্থন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী বার্তা দিচ্ছে। আর তা হলো, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একতরফা নিষেধাজ্ঞার দিন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে এবং বহুমেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা এখন একটি বাস্তবতা।

 

ওয়াশিংটনের এই ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ দেশগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বরং তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে। এর ফলে এশিয়া ও ইউরেশিয়া অঞ্চলে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোটবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের একাধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।

 

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামরিক কূটনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর নিয়ে আসবে বলে আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে বিশ্বাস করে।

 

- পার্সটুডে