আর এই জবাব কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা এবং বেসামরিক অবকাঠামোগুলোও ইসরায়েলের সরাসরি হামলার শিকার হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার একটি প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কথা জানা গেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী ভাষণে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ এই কড়া বার্তা দেন। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, ইসরায়েলের ওপর ইরানের যেকোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হামলার ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
সে ক্ষেত্রে ইরানকে পাল্টা আক্রমণ করার জন্য ইসরায়েল বর্তমানে যে সমস্ত আন্তর্জাতিক বা কৌশলগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে, তা থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ, নিজেদের আত্মরক্ষার স্বার্থে তারা যেকোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে আর বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য মূলত তেহরানের প্রতি তেল আবিবের চরম আগ্রাসী নীতিরই এক নতুন ও ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ভাষণে ইসরায়েল কাটজ আরও আক্রমণাত্মক ও শ্লেষাত্মক মন্তব্য করে বলেন, তারা ইরানের সমস্ত জাতীয় সামরিক এবং বেসামরিক অবকাঠামো-যার মধ্যে দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত জ্বালানি অবকাঠামোও সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-সম্পূর্ণভাবে অচল ও ধ্বংস করে দেবেন।
এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ হবে যে, তা ইরানকে একেবারে প্রস্তর যুগে এবং অন্ধকারের গভীর গহ্বরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে তিনি দম্ভোক্তি করেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীর তরফ থেকে অপর একটি দেশের বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়ার এমন প্রকাশ্য ও সরাসরি হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও যুদ্ধবিধির কতটা পরিপন্থি, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার এই ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ চলে আসছে। এর আগে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এক বিশেষ বিমান যুদ্ধের সূচনা বা সামরিক মহড়া করেছিল ইসরায়েল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ফ্রন্টে সংঘাত ও প্রাণহানি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও, সরাসরি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের লড়াইয়ের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজের এই সাম্প্রতিক হুমকির পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এই রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার সরাসরি ও তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিগত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী দেশ। তাই ইরানের তেলক্ষেত্র বা জ্বালানি অবকাঠামোতে ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে বাজারে এই অস্থিতিশীলতা।
এর ঠিক আগের দিনই বিশ্ব শেয়ারবাজারে এক বড় ধরনের পতন পরিলক্ষিত হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যুদ্ধভীতি এবং চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাজ করায় বৈশ্বিক শেয়ারবাজারগুলোতে এই ধস নেমেছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলের এই ধরনের প্রকাশ্য হুমকির তীব্র সমালোচনা করছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিধি বা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, সংঘাতের সময়ও কোনো দেশের বেসামরিক জনগণের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য স্থাপনা এবং জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালানো সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু ইসরায়েল কাটজের বক্তব্যে সেই ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা করার ন্যূনতম লক্ষণ দেখা যায়নি। পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে আসলেও, সরাসরি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার এমন বেপরোয়া ঘোষণায় মিত্র দেশগুলোও অস্বস্তিতে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই সর্বশেষ মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে গেলে তা যে কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীরভাবে চিন্তিত। বিশ্ব নেতৃত্ব ও জাতিসংঘ পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানালেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র ক্রমশ এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের দিকেই এগোচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।