আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতিতে নতুন করে সামরিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
বৃহস্পতিবার, ৩রা সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় খাতাম আল-আনবিয়ার জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই মাইন স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি তাঁর বার্তায় স্পষ্ট করে জানান যে, বুধবার রাতের এক বিশেষ ও গোপন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশের অবৈধ রুটগুলোতে এসব অতিরিক্ত নৌ মাইন অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছে।
ইরানের এই পদক্ষেপ মূলত ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং তাদের নিয়ন্ত্রণের একচেটিয়া দাবির বিরুদ্ধে একটি সরাসরি ও কঠোর বার্তা হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা। ইরানের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের পানিসীমায় যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে সদা প্রস্তুত।
এই মাইন স্থাপনের ঘোষণার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া সমালোচনা ও উপহাস করেছেন ইব্রাহিম জোলফাগারি। তিনি অত্যন্ত শ্লেষাত্মক ভাষায় মন্তব্য করেন যে, ইরানের এই বাস্তব সামরিক পদক্ষেপের জবাবে মার্কিন সেন্টকম কেবল 'ফটোশপ' সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রণালিটির নাম পরিবর্তন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
মূলত, সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আন্তর্জাতিক জলপথটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে কিছু মানচিত্র ও ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই অমূলক দাবির প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করেই জোলফাগারি তীব্র উপহাসের সুরে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো মনে করছে তাদের সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।
তাই তিনি পরামর্শ দেন, এখন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের তেলবাহী বিশাল জাহাজগুলো পারাপার করার জন্যও সেই ফটোশপ সফটওয়্যারই ব্যবহার করতে পারে। এই ধরনের মন্তব্য দুই দেশের মধ্যকার চলমান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকেই আরও প্রকট করে তোলে।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়ে থাকে।
এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই রুটটি অপরিহার্য। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা সংঘাতের আশঙ্কা সরাসরি বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইরান বহু আগে থেকেই হুমকি দিয়ে আসছিল যে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক স্বার্থ কোনোভাবে ক্ষুণ্ন হলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দেবে। নতুন করে এই মাইন স্থাপনের ঘোষণা সেই পুরোনো হুমকিরই এক নতুন এবং বিপজ্জনক সংস্করণ, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক বিশাল হুমকি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ওই অঞ্চলে তাদের মিত্র দেশগুলোর জন্যও একটি বড় উদ্বেগের কারণ। নৌ মাইন এমন একটি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র যা যেকোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
হরমুজ প্রণালির মতো একটি ব্যস্ত এবং সংবেদনশীল রুটে মাইন বিছানোর অর্থ হলো পুরো আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ এবং বাগ্যুদ্ধ এখন কেবল রাজনৈতিক কূটনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্রমশ সামরিক মহড়ায় রূপ নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী অবাধ জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হলেও, এমন পরিস্থিতি সেই অধিকারকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। উপসংহারে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নতুন নৌ মাইন স্থাপনের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান তাদের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। দুই পরাশক্তির এই মুখোমুখি অবস্থান আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিশ্ব নেতৃত্ব এখন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে এই উত্তেজনা কোনো সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতে রূপ না নেয়।