শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন হামলার জবাব দিতে আর কত অপেক্ষা, জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

মার্কিন হামলার জবাব দিতে আর কত অপেক্ষা, জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক অস্থিরতা যেন কিছুতেই থামছে না। এবার সরাসরি প্রকাশ্য কূটনৈতিক বাদানুবাদে জড়িয়েছেন ইরান এবং জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আরব দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে এক নতুন এবং গভীর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদির সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। শুধু সমালোচনা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং জর্ডানসহ অন্যান্য আরব দেশের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে পরিচালিত হামলার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে এই ঘটনাটিকে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণের একটি নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।

 

অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক অথচ কঠোর ভাষায় তিনি আইমান সাফাদিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে যেসব হামলা চালানো হচ্ছে বা যেসব হামলার ক্ষেত্রে এসব ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করছে, তার জবাব দেওয়ার জন্য তেহরানকে আর ঠিক কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

 

তার এই প্রশ্নটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই একটি শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। আরাগচি তার ওই বার্তায় স্পষ্টতই অভিযোগ করেছেন যে, আরব দেশগুলো তাদের নিজেদের ভূখণ্ডের এবং পাশাপাশি ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

 

কূটনৈতিক অঙ্গনে এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সূত্রপাত মূলত জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদির একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ঘটে। এর আগে সাফাদি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে, মার্কিন হামলার পর আরব দেশগুলোর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু বা স্বার্থের ওপর ইরানের যে দ্রুতগতির হামলা, সেগুলোকে কেবল সাধারণ ‘প্রতিশোধমূলক হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই।

 

তার নিজস্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের এই পদক্ষেপগুলো কোনো তাৎক্ষণিক বা আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এগুলো তেহরানের একটি সুদূরপ্রসারী, সুসংগঠিত ও পূর্বপরিকল্পিত নীতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বস্তুনিষ্ঠ কিন্তু ইরানবিরোধী বিশ্লেষণাত্মক মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছে, যার চূড়ান্ত ও সরাসরি পরিণতি দেখা গেছে এক্সে দেওয়া আরাগচির এই কড়া পোস্টে।

 

এই প্রকাশ্য বাদানুবাদের মধ্যে আব্বাস আরাগচি তার পোস্টে অত্যন্ত গুরুতর এবং স্পর্শকাতর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, অতীতে ইরানের নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন আকস্মিক হামলা।

 

আর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রাণঘাতী হামলাগুলো মূলত আরব দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করেই চালানো হয়েছিল। অর্থাৎ, আরব দেশগুলো তাদের নিজেদের মাটি ব্যবহার করে একটি বিদেশি পরাশক্তিকে ইরানের ক্ষতি করার অবারিত সুযোগ করে দিচ্ছে বলে তিনি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

একজন শীর্ষ ইরানি কূটনীতিকের পক্ষ থেকে এমন প্রকাশ্য এবং গুরুতর অভিযোগ প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ককে যে আরও বেশি জটিল ও তিক্ত করে তুলবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা একমত পোষণ করেছেন।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক বাদানুবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে এবং একে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করে।

 

অন্যদিকে জর্ডানসহ উপসাগরীয় একাধিক দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও সামরিক মিত্রতা রয়েছে। এসব দেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপস্থিতি ইরানের জন্য বরাবরই একটি বড় মাথাব্যথার কারণ।

 

ইরান মনে করে, এসব ঘাঁটির কারণেই তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। আরাগচির এই মন্তব্য যেন সেই পুরোনো কৌশলগত দ্বন্দ্বকেই নতুন মাত্রায় উসকে দিয়েছে।

 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য এবং কড়া বাদানুবাদ প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও দূরত্বের মাত্রা ঠিক কতটা গভীর রূপ ধারণ করেছে।

 

জর্ডানের মতো দেশগুলো একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে তেমনি প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশগুলোর সাথেও একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

কিন্তু আরাগচির এই প্রকাশ্য আক্রমণ জর্ডানের সেই কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন প্রচেষ্টাকে বেশ বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, ইরান ও জর্ডানের এই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য মোটেও ইতিবাচক কোনো বার্তা বহন করে না।

 

এই পরিস্থিতি যদি ভবিষ্যতে আরও প্রলম্বিত হয় বা সামরিক উত্তেজনার দিকে মোড় নেয়, তবে তা সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, আরব বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধমূলক প্রতিরক্ষা নীতি-এই তিনের ত্রিমুখী সংঘাতে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।

 

- আল জাজিরা