নির্বাচনি প্রচারণার সময় ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ স্লোগান দিয়ে দেশকে সাশ্রয়ী জ্বালানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি এক তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথে চলমান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব এখন সরাসরি মার্কিন অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর ওপর পড়তে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সৃষ্ট এই সামরিক সংঘাত কেবল সড়ক যোগাযোগের সাধারণ যানবাহনে ব্যবহৃত পেট্রোলের দাম বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত ডিজেলের দামও সম্প্রতি সর্বকালের সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছে।
একইসঙ্গে উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরম সংকটে পড়েছে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো। অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে বিভিন্ন মার্কিন এয়ারলাইনস ইতিমধ্যে তাদের বিমানের টিকিটের ভাড়া ও লাগেজের অতিরিক্ত মাশুল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।
একই সঙ্গে আর্থিক লোকসান কমাতে তারা তুলনামূলক কম লাভজনক আকাশপথগুলোতে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচলের সংখ্যা কমিয়ে আনার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। জ্বালানি পণ্যের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগমুহূর্তে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক গভীর রাজনৈতিক সংকট ডেকে এনেছে।
যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার এই সময়ে অর্থনৈতিক অভিঘাত সামাল দিতে এবং সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য হোয়াইট হাউসের ওপর চতুর্মুখী চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভোটারদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রশমনে প্রশাসন কী কার্যকর কৌশল অবলম্বন করে, তা এখন ওয়াশিংটনের জাতীয় রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় চলতি সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।
তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় তেল শোধনাগার কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের জরুরি ভিত্তিতে হোয়াইট হাউসে তলব করে সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার সাথে একটি বড় ধরনের তেল চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির মতো অতি সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ট্যাংকারের ওপর ইরানের হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।
এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করতে ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ববর্তী বিভিন্ন পরিবেশগত ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। একই সাথে বাজার নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে দেশটির কৌশলগত মজুত বা ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ার জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে ধারাবাহিক এই পদক্ষেপের ফলে দেশটির জরুরি জ্বালানি মজুত ১৯৮০-এর দশকের শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট অভিমত, হোয়াইট হাউসকে গভীর চাপে ফেলা এই সংকটের কোনো দ্রুত বা সহজ সমাধান বাস্তবিক অর্থে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল শোধনাগারগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কমে যাওয়া তেল পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে বর্তমানে তাদের নিজস্ব সর্বোচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে স্বল্প সময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা থেকে বড় পরিমাণে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ শুরু হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা কার্যকর হতে বহু বছর সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভবত ২০৩৫ সালের আগে সেখান থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব নয়।
ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই প্রচেষ্টাগুলো বর্তমানের উত্তপ্ত বাজার পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো স্বস্তি এনে দিতে পারছে না। জ্বালানি বাজার ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বাস্তবতা হলো স্বল্পমেয়াদে পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষে নতুন করে খুব বেশি কিছু করা সত্যিই কঠিন।
কারণ বিদ্যমান পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রায় সব ধরনের পদক্ষেপই গ্রহণ করে ফেলেছে। এদিকে যুদ্ধের আগে বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যে সহনশীল পর্যায়ে ছিল, তা আবার কবে নাগাদ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, সে বিষয়ে কোনো আশাব্যঞ্জক সময়সীমা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন যে, বাজারে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম কবে পুনরায় যুদ্ধের আগের মতো ৩ ডলারে নেমে আসবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত নন।