বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ও হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ করে তিনি অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছেন। শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবায় তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সর্বাত্মক সংমিশ্রণ বা হাইব্রিড যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানি জাতিকে পরাস্ত করার যে স্বপ্ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখছে, তা কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই বক্তব্যকে চলমান মার্কিন-ইরান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে, কারণ ইরানে জুমার নামাজের খুতবা মূলত রাষ্ট্রীয় নীতিরই একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এবং পার্সটুডে থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খাতামি তার দীর্ঘ খুতবায় বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে ইসলামের প্রাথমিক যুগের নানা ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তিনি সমবেত মুসল্লিদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগেও শত্রুরা ঠিক একইভাবে মুসলমানদের ওপর চরম অর্থনৈতিক অবরোধ ও নানামুখী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু সেই চরম সংকটের সময়েও মুসলমানরা যেমন তাদের অটুট ঈমান, অপরিসীম ধৈর্য এবং নিরলস জিহাদের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, বর্তমান যুগেও ঠিক একইভাবে শত্রুদের সমস্ত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা সম্ভব।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের এই বহুমুখী সংমিশ্রণ যুদ্ধে কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে জয়ী হওয়া যাবে না। বরং আধ্যাত্মিক জিহাদ এবং নিজেদের অর্জিত সম্পদকে দেশ ও দশের কল্যাণে অকাতরে উৎসর্গ করার বা 'ইনফাক'-এর মাধ্যমেই জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে।
পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত একতরফা ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করে তেহরানের এই শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা বলেন, শত্রুরা মূলত অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের স্বাধীনতাকামী সাধারণ জনগণের মনোবল ভেঙে দিতে চায়।
তারা ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে রাখার এবং দেশের ভেতরে কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে জন-অসন্তোষ সৃষ্টির জন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে। কিন্তু আয়াতুল্লাহ খাতামির সুগভীর বিশ্লেষণে, তাদের এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ বিনিয়োগ ও অশুভ প্রচেষ্টা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য।
তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, শত্রুরা শেষ পর্যন্ত তাদের এই কর্মকাণ্ডের জন্য চরম আক্ষেপ করবে। কারণ, অচিরেই তারা অনুধাবন করতে পারবে যে, তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারেনি এবং ইরানি সমাজ আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
উপরন্তু, ইসলামি বিশ্বাস ও ধর্মীয় দর্শন অনুযায়ী, এই ধরনের অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়নমূলক কাজের জন্য শেষ বিচারের দিনে তাদের জন্য অত্যন্ত কঠোর ও মর্মান্তিক শাস্তির বিধান রয়েছে বলেও তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন।
ভাষণের একপর্যায়ে আয়াতুল্লাহ খাতামি অত্যন্ত সরাসরি এবং তীব্র ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে আক্রমণ করেন। বিশেষ করে হোয়াইট হাউসের বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং সাবেক বা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টদের (বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাম্ভিকতার প্রতি সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত করে) কড়া জবাব দেন তিনি।
তিনি বলেন, হোয়াইট হাউসের বোকারা বারবার বিভিন্ন শর্ত দিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণ করার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র তৈরির অবাস্তব স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু হোয়াইট হাউসের ওই বধির ও অন্ধ নীতিনির্ধারকদের খুব স্পষ্টভাবে শুনে রাখা উচিত যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান অনন্তকালের জন্যও কখনো মাথা নত করবে না।
তার এই সরাসরি ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যটি বিশ্ববাসীর সামনে আবারও প্রমাণ করেছে যে, তেহরান তার দীর্ঘদিনের প্রতিরোধমূলক পররাষ্ট্রনীতি থেকে একচুলও সরে আসতে রাজি নয়। যেকোনো মূল্যে তারা নিজেদের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব, ইসলামি আদর্শ ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় চূড়ান্তভাবে বদ্ধপরিকর।
ইরানি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং অটুট প্রতিরোধের ভূয়সী প্রশংসা করে জুমার খতিব আরও বলেন, দেশের আপামর সাধারণ মানুষ তাদের রাতের জমায়েত, স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় সমাবেশ এবং ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্রতিরোধের মাধ্যমে যে অক্লান্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, মূলত তারই সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর রাষ্ট্র সগৌরবে টিকে আছে।
জনগণের এই অটল ও ইস্পাতকঠিন মনোবলই পরাশক্তিগুলোর সমস্ত ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিচ্ছে। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, ইসলামের কট্টর শত্রুরা যেমন হাজার বছর আগে পরাজিত ও পর্যুদস্ত হয়েছিল, ঠিক তেমনি আধুনিক যুগের এই নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোও অর্থনৈতিক আগ্রাসন ও সামরিক আস্ফালন-উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল প্রাঙ্গণে সমবেত হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির উপস্থিতিতে দেওয়া তার এই তেজোদৃপ্ত ভাষণ মূলত সমগ্র ইরানি জাতির জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। এটি একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর কাছে তেহরানের আপসহীন ও প্রতিরোধকামী নীতির এক চূড়ান্ত, দ্ব্যর্থহীন ও শক্তিশালী বার্তা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।