শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর  যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে
ছবি: Collected

ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে হাজার হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ সংকটের চিত্র প্রায় অভিন্ন। প্রখ্যাত ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক রন অ্যাডেলিস্ট সম্প্রতি তার এক গভীর পর্যবেক্ষণে এমনটিই দাবি করেছেন।

 

তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের কারণে এই দুটি দেশ বর্তমানে এমন এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ বিভাজনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা যেকোনো মুহূর্তে চরম সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই ইসরায়েলি বিশ্লেষকের মূল্যায়নটি বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হিব্রু ভাষার প্রভাবশালী পত্রিকা মারিভ-এ প্রকাশিত এক বিস্তৃত নিবন্ধে অ্যাডেলিস্ট উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এতটাই নিবিড়ভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত যে, কে কাকে বেশি প্রভাবিত করছে তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।

 

উভয় দেশের আকার এবং ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও দেশ দুটির রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রায় একই সমান্তরালে অগ্রসর হচ্ছে। অ্যাডেলিস্টের মতে, কাঠামোগত দিক দিয়ে ইসরায়েলকে কার্যত আমেরিকার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

 

বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করে এবং অন্যদিকে ইসরায়েল নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু এই ইসরায়েলি বিশ্লেষক এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

তার ভাষায়, এগুলো মোটেও প্রকৃত গণতন্ত্র নয়, বরং এগুলো হলো ‘শর্তসাপেক্ষ গণতন্ত্র’। এই শর্তটি হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কট্টর অর্থনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো স্বৈরতান্ত্রিক নেতাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে যে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন, তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মনে করেন।

 

বাস্তবতার নিরিখে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কখনোই প্রকৃত অর্থে শতভাগ গণতান্ত্রিক আদর্শ ধারণ করেনি বলে অ্যাডেলিস্ট যুক্তি দেখান। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে একটি আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যের মতোই আচরণ করে আসছে।

 

অন্যদিকে, নিজেদের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরায়েল নিজেকে একটি অবরুদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে এবং এই অজুহাতে তারা স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে অবদমন করাকেই নিজেদের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

 

বিশ্লেষক অ্যাডেলিস্টের মতে, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু ক্ষমতায় আসার পর দেশ দুটির এই তথাকথিত শর্তসাপেক্ষ গণতন্ত্রের আসল রূপটি জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমানে উভয় দেশেই এমন এক ধরনের অনমনীয় আত্মপরিচয়গত সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যেখানে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী কেবল মতাদর্শগতভাবেই বিভক্ত নয়, বরং তারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার মতো বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছেছে।

 

এর ফলে দুটি দেশই প্রায় একই ধরনের গভীর সাংবিধানিক সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ব্যাপক ভিন্নতা থাকলেও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে তাদের দুজনের কৌশল প্রায় অভিন্ন।

 

অ্যাডেলিস্ট এই দুই নেতার ব্যক্তিগত চরিত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ট্রাম্পকে একজন 'রোগগ্রস্ত আত্মপ্রেমিক' এবং 'শিশুসুলভ আত্মমুগ্ধতায় ভোগা ব্যক্তি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, ট্রাম্প প্রায়শই বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন খণ্ডিত তথ্যের ওপর নির্ভর করেন এবং তার সহযোগীরা শত চেষ্টা করেও অনেক সময় তাকে জনসমক্ষে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে পারেন না।

 

অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে তিনি এমন একজন ধূর্ত ও সতর্ক নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার কাছে নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকার বিষয়টি অন্য যেকোনো জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার স্বার্থে নেতানিয়াহু রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গৌণ বা তুচ্ছ বলে মনে করেন।

 

এই দুই বিতর্কিত নেতার রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পেছনে তাদের নিজস্ব আশীর্বাদপুষ্ট গণমাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে অ্যাডেলিস্ট উল্লেখ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ এবং ইসরায়েলের চ্যানেল ফোরটিন-এর উদাহরণ টেনে বলেন, এই গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে এবং অন্ধভাবে নিজেদের নেতাদের সমর্থন জুগিয়ে যায়।

 

এই ধরনের গণমাধ্যম এমন একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক ‘বুদবুদ’ বা বলয় তৈরি করে, যেখানে নেতাদের মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্যকে সুকৌশলে আড়াল করা হয়। রাষ্ট্রীয় যেকোনো বিপর্যয় বা খারাপ ঘটনাকে এই নেতারা নিছক 'পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত ক্ষতি' হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

 

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে এই নেতারা আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত হঠকারী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। অ্যাডেলিস্ট এটিকে যেকোনো আন্তর্জাতিক ফ্রন্টে পরাজয়ের একটি নিশ্চিত নিয়ামক হিসেবে সতর্ক করেছেন।

 

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বলয় সুরক্ষিত থাকার কারণে সামরিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরও তারা তাৎক্ষণিক কোনো রাজনৈতিক পরিণতির সম্মুখীন হন না। ট্রাম্পের শাসনামলে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের উত্তেজনা এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে সিরিয়া, লেবানন, গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান ধ্বংসাত্মক সংঘাত তারই প্রমাণ।

 

এই ইসরায়েলি বিশ্লেষক তার সুদীর্ঘ পর্যালোচনার শেষে এই উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু বর্তমানে যে বিপজ্জনক নীতি অনুসরণ করছেন তা তাদের দেশগুলোকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দুই নেতার চূড়ান্ত রাজনৈতিক পতনও খুব সম্ভবত একই ধরনের সংক্ষিপ্ত ও নাটকীয় গতিপথ অনুসরণ করবে।

 

- পার্সটুডে