তেহরানের সামরিক নেতৃত্ব অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেকোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হুমকি দৃশ্যমান হলেই তারা আর নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের অপেক্ষায় থাকবে না; বরং তাৎক্ষণিকভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে আগাম বা পূর্বপ্রস্তুতিমূলক সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে।
দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক অতীতের নানামুখী যুদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত থেকে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের সামগ্রিক রণকৌশল নতুন করে পুনর্বিন্যাস করেছে।
ফলস্বরূপ, এই দুই সামরিক শক্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি সামরিক প্রস্তুতি, উন্নত মনোবল ও প্রখর আত্মবিশ্বাস নিয়ে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের মুখে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়ার এই বক্তব্য প্রকাশ্যে এসেছে।
জেনারেল আকরামিনিয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শত্রুভাবাপন্ন যেকোনো শক্তির বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রমে ইরান বর্তমানে গতানুগতিক বা প্রথাগত সামরিক পদ্ধতির পরিবর্তে অপ্রতিসম যুদ্ধপদ্ধতি এবং সুসমন্বিত বহুমাত্রিক রণকৌশল প্রয়োগ করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, রণক্ষেত্রে এই নতুন যুদ্ধকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ইতিমধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক ও কার্যকর ফলাফল পাওয়া গেছে। সর্বাধুনিক নজরদারি, চালকবিহীন আকাশযান প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার যৌথ ব্যবহারের ফলে প্রতিপক্ষের যেকোনো অত্যন্ত সুরক্ষিত ও কৌশলগত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছে।
তাঁর মতে, সামরিক কাঠামোর এই অভাবনীয় আধুনিকায়ন শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ ও পালটা আঘাত হানার সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। নিজেদের সামরিক দর্শনে আসা এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের পটভূমি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া জানান, বিশেষ করে আলোচিত বারো দিনের যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ফলাফল পর্যালোচনার পর থেকেই ইরানের সামগ্রিক সামরিক পরিকল্পনা ধীরে ধীরে আগাম আঘাত বা পূর্বপ্রস্তুতিমূলক অভিযানের দিকে ধাবিত হয়েছে।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে গৃহীত এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। একই সাথে তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক সামরিক বিধিমালার পাশাপাশি জাতিসংঘ সনদে সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার যে অবিচ্ছেদ্য অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে, তার আলোকেই তেহরান যেকোনো আসন্ন হুমকি মোকাবিলায় আগেভাগে পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্ণ আইনি বৈধতা রাখে।
আগাম সামরিক পদক্ষেপের বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে গিয়ে এই ইরানি জেনারেল অতীতে জর্ডান, সিরিয়া এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে পরিচালিত ধারাবাহিক হামলার ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেন।
জেনারেল আকরামিনিয়ার ভাষ্য মতে, ওই হামলাগুলো নিছক কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ ছিল না; বরং তা ছিল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া মারাত্মক হুমকি ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত অত্যন্ত নিখুঁত ও সুপরিকল্পিত আগাম প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযান।
ভবিষ্যতের সামরিক রণনীতি সম্পর্কে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় এই আপসহীন সামরিক অবস্থান ভবিষ্যতেও পুরোপুরি বহাল থাকবে। জেনারেল আকরামিনিয়া জোর দিয়ে বলেন, যখনই কোনো বৈরী শক্তির পক্ষ থেকে ইরানের নিরাপত্তা কিংবা ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র হুমকি অনুভূত হবে, তখনই আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত নীতিমালার মধ্যে থেকেই তেহরান আত্মরক্ষার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করবে এবং বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক আগাম সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত অনুযায়ী, ইরানের পক্ষ থেকে এই আগাম হামলা পরিচালনার প্রকাশ্য ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে এক গভীর পরিবর্তন ও নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ওয়াশিংটন এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে তেহরানের দীর্ঘদিনের বিরোধ যখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে, তখন ইরানের এই আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর বদলে সম্ভাব্য আঘাতের উৎসকে শুরুতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই সামরিক কৌশল মূলত প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগতভাবে চাপে রাখার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।