আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরনের সরাসরি হুমকি নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এমন কঠোর বার্তা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়েও একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি প্রায় অভিন্ন ভাষায় তেহরানকে সতর্ক করেছিলেন।
সে সময় ‘হিউ হিউইট শো’-তে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পুরোপুরি ধ্বংস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ইরানিদের সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। তার এই ধারাবাহিক হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক হুমকির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা স্থাপনাটি কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এই স্থাপনাটিকে গভীর সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে আসছেন।
তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই বিশাল ও দুর্ভেদ্য পাহাড়ের গভীরে ইরান অত্যন্ত গোপনে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিপজ্জনক বিস্তার ঘটাচ্ছে। নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার একেবারে সন্নিকটে অবস্থিত এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন। নাতাঞ্জের মূল স্থাপনাটি অতীতে বিভিন্ন সময়ে অন্তর্ঘাতমূলক হামলা ও সাইবার আক্রমণের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সেই ক্ষয়ক্ষতির পর ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সুরক্ষিত করার জন্য নতুন কৌশল গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের দিকে এই পাহাড়ের পাদদেশে ব্যাপক খননকাজ শুরু হয়। ধীরে ধীরে শক্ত গ্রানাইট পাথরের কয়েকশ মিটার গভীরে দুটি অত্যাধুনিক সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়, যা আধুনিক সামরিক প্রকৌশলবিদ্যার এক বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
এই দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইরানের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমা সামরিক ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের জোরালো সন্দেহ, পাহাড়ের এত গভীরে ইরান মূলত একটি অঘোষিত ও গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে।
তাদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি তেহরানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত বিকল্প’। তবে ইরান বরাবরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই সন্দেহ ও অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
তেহরানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি কেবল সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন এবং গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে; এর সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও, পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের এই আশ্বাসে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ঘিরে ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। স্থাপনাটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং কাঠামোগত গভীরতাই এই সংশয়ের মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ এই সুড়ঙ্গগুলো শক্ত পাথরের এত গভীরে তৈরি করা হয়েছে যে, প্রথাগত সামরিক আক্রমণ দিয়ে এগুলোর কোনো দৃশ্যমান ক্ষতি করা প্রায় অসম্ভব।
এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অস্ত্রাগারে মজুত থাকা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর ও শক্তিশালী বাংকার-বিধ্বংসী বোমাগুলোও এত গভীরে প্রবেশ করে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
গ্রানাইট পাথরের কয়েকশ মিটার পুরু স্তর ভেদ করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সর্বাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির জন্যও এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ঠিক এই সামরিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুমকিটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষ পর্যালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাহাড়ের কয়েক শ মিটার গভীরে থাকা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সুরক্ষিত স্থাপনাকে কীভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী লক্ষ্যবস্তু করবে বা সেটি ধ্বংস করার জন্য নতুন কোনো অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যদি সত্যিই এ ধরনের কোনো আক্রমণ সংঘটিত হয়, তবে তা শুধু ইরান নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পারমাণবিক স্থাপনায় যেকোনো ধরনের আক্রমণ বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন সংকটের জন্ম দেবে। আপাতত পুরো বিশ্ব গভীর উদ্বেগের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রাখছে।