শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বেসামরিক নাগরিকসহ নিহত শতাধিক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বেসামরিক নাগরিকসহ নিহত শতাধিক
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী অত্যন্ত কৌশলগত ও ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে দেশটির সরকারি সামরিক বাহিনী এবং হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছে।

 

গত কয়েক দিন ধরে চলা এই ভয়াবহ ও সর্বাত্মক সামরিক লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক যোদ্ধা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের ঘটনায় যুদ্ধকবলিত অঞ্চলটিতে এক চরম মানবিক বিপর্যয় ও গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কেবল শনিবারের কয়েক ঘণ্টার টানা ও তীব্র সংঘর্ষেই উভয় পক্ষের অন্তত ষাট জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই সংঘাত পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে আবারও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশেষ প্রতিবেদনে স্থানীয় সামরিক ও হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, শনিবার সকাল থেকে মোখা শহরের বিভিন্ন কৌশলগত প্রবেশপথ ও সামরিক অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ নিতে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল গোলাগুলি ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়।

 

ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে যে, হুতিদের আকস্মিক ও সুপরিকল্পিত হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সম্মুখসমরে সরকারি বাহিনীর অন্তত ছাব্বিশ জন নিয়মিত সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।

 

অন্যদিকে, বিভিন্ন সামরিক সূত্র এবং স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রদান করা তথ্যানুযায়ী, সরকারি বাহিনীর জোরালো পালটা প্রতিরোধ ও সমন্বিত পদক্ষেপের মুখে বিদ্রোহী হুতি শিবিরের অন্তত একত্রিশ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

 

হাসপাতালগুলোতে অনবরত আহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে, যাদের মধ্যে অনেকের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও এই বিধ্বংসী সংঘাতের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক শিকার হচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ ধরে ইয়েমেনের অপর সংঘাতপীড়িত নগরী তাইজে এক মারাত্মক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতি বিদ্রোহীরা।

 

ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি যাত্রীবাহী বেসামরিক গণপরিবহন বা বাসের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। আকস্মিক ও বর্বরোচিত এই হামলায় বাসে থাকা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন বেসামরিক নাগরিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং নারী ও শিশুসহ আরও সাতজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

 

আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাদের নিবিড় চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বার্থের বলি হয়ে এভাবে নিরপরাধ মানুষের জীবনাবসানের ঘটনায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

 

ভৌগোলিক ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত মোখা বন্দরটির গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহাসিক এই বন্দরনগরী বাব এল-মান্দেব প্রণালির অত্যন্ত সন্নিকটে হওয়ায় বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এটি এক অতীব স্পর্শকাতর সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বন্দরটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, তারা কৌশলগতভাবে শুধু স্থলভাগেই নয়, বরং লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমাতেও নিজেদের শক্তিশালী প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

 

মূলত এই কৌশলগত আধিপত্য নিশ্চিত করা এবং সামরিক রসদ সরবরাহের পথগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যেই হুতি বিদ্রোহীরা বারবার মোখা বন্দরের ওপর মরিয়া আক্রমণ চালিয়ে আসছে।

 

পক্ষান্তরে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের সরকারও তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা বহুমুখী গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে চরম মানবিক বিপর্যয়, খাদ্যসংকট ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে ভয়াবহ দুর্দশার শিকার হয়েছেন।

 

বারবার আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই সমাধানের পথ এখনো সুগম হয়নি। মোখা বন্দর এবং আশপাশের অঞ্চলে নতুন করে শুরু হওয়া এই তীব্র সংঘাত সেই ভঙ্গুর পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলছে।

 

আবাসিক এলাকার সন্নিকটে ভারী মারণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের অব্যাহত ব্যবহারে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বারবার রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও রণাঙ্গনের কঠোর বাস্তবতায় কোনো পক্ষই পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।

 

- এএফপি