একই সঙ্গে ইরানের মিনাব ও সিরিক শহরে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর মার্কিন সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক হামলাকে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং ‘সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আহাদ-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিশদ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন, যা পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এবং পার্সটুডে প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই মুহূর্তে এই ইরাকি বিশেষজ্ঞের বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করছে, কারণ এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সমীকরণ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
সাক্ষাৎকারে আদনান আল-কানানি চলমান সংঘাতে ইরানের সামরিক কৌশল এবং রণনীতির ব্যাপক প্রশংসা করেন। তার মতে, ইরান অত্যন্ত সফলভাবে এবং সুপরিকল্পিতভাবে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুকে নিজেদের মূল ভূখণ্ড থেকে সরিয়ে হরমুজ প্রণালির দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
এটি ইরানের একটি বিশাল কৌশলগত বিজয়। কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পানিপথ। যুদ্ধকে এই অঞ্চলে স্থানান্তরিত করার মাধ্যমে ইরান মূলত বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
এই সামরিক বিশেষজ্ঞ দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক সহনশীলতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মতে, চলমান এই সংঘাত বা যুদ্ধ যখনই শেষ হোক না কেন, যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য তথা বৈশ্বিক জোটগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দেবে ইরান।
নতুন এই সমীকরণে ইরান যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একতরফা শর্ত মেনে নিয়ে আপস বা আলোচনায় যাবে না, সেটি এখন দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়েও তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেন আল-কানানি।
বিশেষ করে মিনাব শহরের একটি সাধারণ স্কুল এবং সিরিক শহরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাকে তিনি সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, বর্তমান যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যে ধরনের অত্যাধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম এবং স্যাটেলাইট নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে সামরিক এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে না পারার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা সম্ভব। ইরাকি এই সামরিক বিশেষজ্ঞ আরও ব্যাখ্যা করেন যে, যেকোনো আধুনিক যুদ্ধে প্রতিটি সামরিক অভিযান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে।
এখানে ভুল বা আকস্মিক দুর্ঘটনার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেসামরিক ভবন এবং সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যমান, তাই মিনাবের স্কুল এবং সিরিকের বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো সম্পূর্ণ বেসামরিক জনসমাগমে তাদের এই হামলা কোনোভাবেই ভুলবশত হয়নি।
আল-কানানি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, এই প্রাণঘাতী হামলাগুলো ছিল সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ও পূর্বপরিকল্পিত। আর আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি, মানবাধিকার আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষ, নারী-শিশু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক অনুষ্ঠানের ওপর সামরিক হামলা চালানো সন্দেহাতীতভাবে একটি ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ।
সার্বিকভাবে, আদনান আল-কানানির এই বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত কড়া ও পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে যে, কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন, ভয়ভীতি বা আগ্রাসন দিয়ে ইরানকে রাজনৈতিকভাবে নতজানু করা বা তাদের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা প্রায় অসম্ভব।
বরং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এ ধরনের নির্বিচার ও অমানবিক হামলা স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে একটি দীর্ঘস্থায়ী, বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল রূপ দিচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসন ও তাদের সামরিক জোট যদি এই ধারণা পোষণ করে থাকে যে, অন্যায় সামরিক চাপ প্রয়োগ করে এবং একতরফা ও অন্যায্য শর্ত চাপিয়ে দিয়ে তারা তেহরানকে তাদের ছকে বাঁধা আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে, তবে ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি হবে তাদের জন্য এক বিরাট ও ঐতিহাসিক কৌশলগত ভুল।
কারণ, ইরান এখন শুধু নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আত্মরক্ষাই নিশ্চিত করছে না, বরং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরোধ বলয় গড়ে তুলে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর একাধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।