শনিবার অনুষ্ঠিত এই বহুজাতিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদানকালে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই তার দেশের ওপর চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডগুলোকে 'যুদ্ধাপরাধের সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশ্বমঞ্চে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের দ্বৈত নীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি এই মন্তব্য করেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও বৈশ্বিক আইনকাঠামো যেন কোনো নির্দিষ্ট সামরিক পরাশক্তির প্রভাবমুক্ত থাকে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেই আহ্বানও তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সামনে তুলে ধরেন।
বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই ব্রিকস সম্মেলন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর এই জোটে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে ইরানের প্রধান বিচারপতি সদস্য দেশগুলোর প্রতি তেহরানের সার্বভৌমত্বের ওপর পরিচালিত সকল প্রকার আগ্রাসন, নাশকতা ও সামরিক হুমকির কঠোর নিন্দা জানানোর উদাত্ত আহ্বান জানান।
তিনি জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে ইরানের বিরুদ্ধে যারা এই ধরনের বর্বরোচিত ও তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জবাবদিহির আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ন্যায়বিচারের সর্বজনীন ও বৈশ্বিক মানদণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও যৌক্তিক বক্তব্য প্রদান করেন। বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমাদের প্রকৃত ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এই ন্যায়বিচার কোনোভাবেই মানবসৃষ্ট, বাছাই করা বা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া উচিত নয়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে স্পষ্ট করে বলেন, মুষ্টিমেয় কিছু দেশের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক বিবেচনার কাছে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনকে কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
বিশ্বমঞ্চে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক ক্ষমতার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে তার আইনি অধিকার কখনোই নির্ধারিত হতে পারে না। আইনের চোখে সকল স্বাধীন, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থার একমাত্র মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দীর্ঘ ও কণ্টককীর্ণ সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইরানের বিচার বিভাগের শীর্ষ এই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, নিজেদের দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা নিশ্চিত করতে ইরানের সাধারণ জনগণকে ঐতিহাসিকভাবে এক বিরাট ও চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে চলা নানা ধরনের অন্যায্য আন্তর্জাতিক অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ ও ক্রমাগত সামরিক হুমকির মুখেও ইরান তার নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নীতি ও আদর্শ থেকে কখনোই একচুল পরিমাণ সরে আসেনি।
তিনি অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও আইন পদদলিত করে ইরানের অভ্যন্তরে যে ধরনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা, গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ ও সামরিক আগ্রাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিধির সরাসরি বরখেলাপ।
সম্মেলনে উপস্থিত অন্যান্য ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর প্রতি একটি সুস্পষ্ট ও দূরদর্শী সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন মোহসেনি এজেই। তিনি গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আজ আন্তর্জাতিক আইনের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে দাম্ভিক শত্রুপক্ষ ইরানে যে ধরনের নির্মম যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করছে এবং নির্লজ্জভাবে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে, তা যদি বিনা বাধায় চলতে থাকে, তবে আগামী দিনে বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও ঠিক একই ধরনের ভয়াবহ ও অস্তিত্ববিনাশী পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতে পারে।
পরাশক্তিগুলোর এই বেপরোয়া ও আধিপত্যকামী আচরণের বিরুদ্ধে ব্রিকস জোট যদি এখন থেকেই সম্মিলিতভাবে রুখে না দাঁড়ায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা চরম ও স্থায়ী হুমকির মুখে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের নিরবচ্ছিন্ন টানাপোড়েনের মধ্যে এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক জোটের সম্মেলনে বিচার বিভাগীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন কড়া ও সময়োপযোগী বার্তা প্রদান অত্যন্ত অর্থবহ।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে একটি জোরালো জনমত গঠন করা এবং ব্রিকসের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান বিকল্প বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করা।
আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর, নিরপেক্ষ প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করার যে আহ্বান ইরান জানিয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনি লড়াইয়ে নতুন মাত্রার মেরুকরণের সৃষ্টি করতে পারে।