আগামী অক্টোবর মাসে এই বহরের জাহাজগুলো অবরুদ্ধ গাজার উপকূলের দিকে তাদের চূড়ান্ত ও কাঙ্ক্ষিত যাত্রা শুরু করবে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। পার্স টুডের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর প্রদক্ষিণ করার পর এই আন্তর্জাতিক নৌবহরটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি গভীর সংহতি জানিয়ে গাজার অভিমুখে অগ্রসর হবে।
এই দুঃসাহসিক ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো অবরুদ্ধ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাবাসীর কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিস্পৃহ দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই বেআইনি অবরোধের অবসান ঘটাতে বিশ্বব্যাপী প্রবল জনমত ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
নতুন এই মিশন সম্পর্কে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন তাদের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছে যে, গাজায় চলমান অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় এবং নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের কারণে তারা আবারও উত্তাল সমুদ্রপথে এই প্রতিবাদী যাত্রা শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিবৃতিতে জোটটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছে, "আমরা পুনরায় আমাদের এই যাত্রা শুরু করছি কারণ ইসরাইল এখনো তাদের পরিচালিত ভয়াবহ গণহত্যা বন্ধ করেনি এবং ফিলিস্তিন আজও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারেনি।"
এই মিশনটি কেবল একটি গতানুগতিক ত্রাণবাহী যাত্রা নয়, বরং এটি গাজার ওপর আরোপিত দীর্ঘস্থায়ী ও অমানবিক অবরোধকে সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সমন্বিত প্রয়াস।
জোটের নেতৃবৃন্দ প্রবলভাবে আশা করছেন, ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে তাদের এই ধারাবাহিক যাত্রাবিরতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিলিস্তিন সংকট সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং অবরোধ অবসানের ন্যায্য দাবিতে ইউরোপীয় সরকারগুলোর ওপর জনগণের চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
প্রকাশিত বিবৃতি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন মিশনের অংশ হিসেবে 'হানজালা দুই' নামের একটি সুসজ্জিত জাহাজ গত জুন এবং জুলাই মাসে নরওয়ে, সুইডেন এবং ডেনমার্কের বিভিন্ন বন্দরে সফলভাবে যাত্রাবিরতি করেছে। অন্যদিকে, 'কেট' নামের অপর একটি জাহাজ গত আগস্ট মাসে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল বন্দর থেকে তার প্রতিবাদী যাত্রা শুরু করে।
এরপর জাহাজটি আয়ারল্যান্ড, জার্মানি এবং ফ্রান্সের বন্দরে নোঙর করেছে। চূড়ান্তভাবে গাজার দিকে রওনা হওয়ার আগে এই প্রতিবাদী নৌবহরের জাহাজগুলো স্পেন, পর্তুগাল এবং ইতালির বন্দরে থামার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ফ্রিডম ফ্লোটিলা জোট আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, সমুদ্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজগুলো আগামী অক্টোবর মাসে গাজা উপকূলে পৌঁছানোর চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গাজা অভিমুখে এই সাহসী, ঐতিহাসিক ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার কর্মী, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সাহসী প্রতিনিধি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য অধিকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানানো অসংখ্য সাধারণ নাগরিক।
ইউরোপের প্রতিটি বন্দরে যাত্রাবিরতিকালে এই জোটের সদস্যরা স্থানীয় জনগণের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করছেন। তারা সাধারণ নাগরিকদের প্রতি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ আহ্বান জানাচ্ছেন যেন তারা নিজ নিজ দেশের সরকারের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেন।
বিশেষ করে ইসরাইলে সব ধরনের মারণাস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহ অবিলম্বে বন্ধ করা, দেশটির সাথে বিদ্যমান সব ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ইসরাইলের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার দাবিটি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এই সংহতি মিশনে অংশগ্রহণকারী একজন মার্কিন নাগরিক গাজা অভিমুখে যাত্রার সম্ভাব্য ভয়াবহ বিপদ ও প্রাণহানির শঙ্কা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থেকেও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিজেদের আপসহীন অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, এই প্রতিবাদী পদক্ষেপের সাথে চরম জীবনহানির ঝুঁকি ও গুরুতর বিপদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও এই চরম সংকটের মুহূর্তে নিশ্চুপ থাকা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। তার মতে, বিশ্ববাসীর এই নীরবতা এবং নিষ্ক্রিয়তার জন্য অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি জনগণ এবং সমগ্র বিশ্বকে ভবিষ্যতে আরও অনেক বড়, ভয়ানক ও মর্মান্তিক মূল্য চোকাতে হবে।
তাই নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকির মুখেও তারা শোষিত মানুষের পক্ষে ন্যায়ের ঝান্ডা তুলে ধরার অটল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সংহতি মিশনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর তরফ থেকে নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস নতুন কিছু নয়।
চলতি ২০২৬ সালের বসন্তকালে এই নৌবহরের পূর্ববর্তী একটি মিশনের সময় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় শত শত মানবাধিকার কর্মীর ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিল এবং তাদের বেআইনিভাবে বন্দি করেছিল।
পরবর্তীতে সেই অন্ধকার বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া স্বেচ্ছাসেবকরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে তাদের ওপর চালানো অকথ্য নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। আটকদের অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দি অবস্থায় তারা ইসরাইলি বাহিনীর হাতে অমানবিক ও নির্মম মারধরের শিকার হয়েছেন, অনেকের শরীরের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং কেউ কেউ সরাসরি গুলির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন।
এমনকি তাদের ওপর বারবার বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ এবং যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতার এমন ভয়াবহ ও নির্মম বাস্তবতা সত্ত্বেও গাজার অবরুদ্ধ মানুষের অধিকার আদায়ের অস্তিত্ব রক্ষার এই সংগ্রামে ফ্রিডম ফ্লোটিলার এবারের যাত্রাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্প্রদায় এক অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে মূল্যায়ন করছে।