এই মিত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস, ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি এবং ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়া দল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে শীর্ষস্থানীয় ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘জেরুজালেম পোস্ট’ তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছে।
সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের এই দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি এবং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই মূলত ইরানের এই বৃহত্তর ও সমন্বিত হামলার গোপন পরিকল্পনার বিষয়টি উন্মোচিত হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
ইসরায়েলের নীতিনির্ধারক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পূর্বের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে এবারের সম্ভাব্য হামলাটি হতে পারে অনেক বেশি সুপরিকল্পিত এবং কৌশলগতভাবে ধ্বংসাত্মক।
এই বর্তমান প্রেক্ষাপটটি গভীরভাবে বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ফিরে তাকাতে হচ্ছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সেই ঐতিহাসিক দিনটির দিকে। ওই দিন অবৈধভাবে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বা ইসরায়েলে গাজার স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস এক আকস্মিক ও নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছিল, যা পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়।
তবে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই সময়কার ঘটনাবলির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব। হামাস যখন সেই হামলাটি পরিচালনা করে, তখন তারা তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান বা লেবাননের হিজবুল্লাহকে এই বিষয়ে আগে থেকে বিস্তারিতভাবে কিছুই অবহিত করেনি।
ফলে, হামাস সম্পূর্ণ একাকী নিজেদের সিদ্ধান্তে সেই অভিযানের সূচনা করেছিল এবং ইরান বা হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্ররা সেই মুহূর্তে পূর্ণ শক্তি নিয়ে একসঙ্গে যুদ্ধে যোগদান করেনি।
ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এখন মনে করছেন, অতীতে একসঙ্গে হামলা না চালানোর ফলে যে কৌশলগত শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, এবার সেটিই পূরণ করতে চাইছে তেহরান। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার সব কটি ফ্রন্টকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর ছক কষছে।
জেরুজালেম পোস্টের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, কেবল ইসরায়েলি সূত্রই নয়, বরং বিভিন্ন আরব সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো থেকেও ঠিক এমন স্পষ্ট ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।
আরব বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইরান এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপে আগ্রহী নয়; বরং তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে একাধিক রণাঙ্গন উন্মুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর সহজ অর্থ হলো, ইসরায়েলকে এবার একই সময়ে উত্তর দিক থেকে লেবাননের হিজবুল্লাহ, দক্ষিণ ও লোহিত সাগরমুখী অঞ্চল থেকে ইয়েমেনের হুতি, পূর্ব দিক থেকে ইরাকি মিলিশিয়া এবং ভেতর থেকে হামাসের মতো বহুমুখী শক্তির তীব্র আক্রমণের শিকার হতে হবে।
চারদিক থেকে ধেয়ে আসা এমন একটি ত্রিমাত্রিক বা চতুর্মুখী হামলা যেকোনো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই এক অভাবনীয় ও মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
এই বিশাল ও সমন্বিত পরিকল্পনাটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে মিত্রদের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ ও যোগাযোগ শুরু হয়ে গেছে বলেও সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অত্যন্ত চৌকস ও অভিজাত শাখা ‘কুদস ফোর্স’-এর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সম্প্রতি এক গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন।
এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাকি মিলিশিয়া বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা অংশগ্রহণ করেন। তাদের এই দীর্ঘ ও রুদ্ধদ্বার আলোচনার মূল বিষয়বস্তুই ছিল পুরো অঞ্চলে উত্তেজনার মাত্রা কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায় এবং ইসরায়েলের ওপর কীভাবে একটি সুসমন্বিত, যুগপৎ ও শক্তিশালী আঘাত হানা সম্ভব হয়, তার একটি চূড়ান্ত সামরিক রূপরেখা প্রণয়ন করা।
কুদস ফোর্সের এই বৈঠককে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করছেন। কারণ, ইরানের এই বিশেষ বাহিনীটি মূলত দেশের বাইরে সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করে থাকে।
এমন শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক বৈঠকের অর্থ হলো, সম্ভাব্য হামলার ছক এখন আর কেবল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সামরিক স্তরে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এমন কোনো বহুমুখী আক্রমণ শুরু হলে তা কেবল ইসরায়েল ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।