সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইরানের ৯ বিলিয়ন ডলার লেনদেন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইরানের ৯ বিলিয়ন ডলার লেনদেন
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বহুমুখী বিধিনিষেধ ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা থেকে তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্যেই মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবাহের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কেবল ২০২৪ সালেই প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ইরানি অর্থ ঘুরেফিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হয়েছে।

 

সরাসরি কোনো লেনদেন না হলেও মধ্যবর্তী দেশগুলোর আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ছদ্মবেশী বাণিজ্যিক সংস্থা ও মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রের সুচতুর জাল ব্যবহার করে এই অর্থ আন্তর্জাতিক আর্থিক চক্রে প্রবেশ করেছে। ফলে দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ ও নজরদারি কাঠামোর সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই অর্থ স্থানান্তরের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তথাকথিত ‘করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার সুবাদে মার্কিন ভূখণ্ডে কোনো স্থায়ী শাখা না থাকলেও বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ডলার লেনদেন চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার সুযোগ পায়।

 

ইরানের সঙ্গে যুক্ত তহবিলগুলো একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতবদল হওয়ার সময় বিভিন্ন নামসর্বস্ব কোম্পানি ও অর্থ বিনিময় সংস্থার আড়ালে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে ফেলে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুসারে, এই বিপুল অর্থপ্রবাহ রুখতে বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছে।

 

'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট' শীর্ষক উদ্যোগের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত যেকোনো সংস্থাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তেহরানের এই আর্থিক টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি।

 

যুক্তরাষ্ট্র এই রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও তেহরান জলপথে বিকল্প বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পণ্য সরবরাহ ও জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় আশি শতাংশেরও বেশি ক্রয় করছে চীন, যার পরিমাণ দৈনিক পাঁচ লাখ ব্যারেলেরও বেশি।

 

আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত ট্যাংকারগুলোর মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের কৌশল নেওয়া হয়, যাতে জ্বালানির আদি উৎস শনাক্ত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ভর্টেক্সার বরাতে জানা যায়, বর্তমানে এশিয়ার সমুদ্রসীমার বিভিন্ন ভাসমান জাহাজে প্রায় আট কোটি ব্যারেল ইরানি তেল মজুত রয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী আপৎকালীন সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে।

 

মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বেইজিংয়ের সঙ্গে লেনদেনে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে তেহরান। তেলের বিনিময়ে প্রাপ্ত ইউয়ান দিয়ে চীন থেকে শিল্পপণ্য ও প্রযুক্তিগত সেবা আমদানি করা হচ্ছে, এমনকি তেলের অর্থের বিনিময়ে ইরানে অবকাঠামো বিনির্মাণের মতো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিও বাস্তবায়িত হচ্ছে।

 

প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থার নজরদারি এড়াতে ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিকল্প আর্থিক মাধ্যমও ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। গবেষকদের মতে, সমরাস্ত্র সংগ্রহ ও বাণিজ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন করেছে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

 

যদিও মার্কিন প্রশাসন একাধিক ডিজিটাল মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ জারি করে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল জব্দ করেছে, তবুও এগুলোর বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর কারণে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অতি প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার ও ইউরো সংগ্রহের স্বার্থে হংকং ও দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের গোপন নেটওয়ার্ক।

 

এই কাঠামোর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ সহজেই দিরহাম কিংবা অন্যান্য শক্তিশালী মুদ্রায় রূপান্তরিত হচ্ছে এবং অর্থের মূল উৎস সম্পূর্ণভাবে আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে। মিশরের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার মাধ্যমে ইরানের ছায়া নেটওয়ার্কের প্রায় এক দশমিক আট বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির প্রবেশাধিকার সীমিত করে ওয়াশিংটন।

 

এটি প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক ডলার লেনদেনের উন্মুক্ত ব্যবস্থাটিই অজান্তে নিষিদ্ধ অর্থের বিকল্প প্রবেশদ্বারে পরিণত হচ্ছে। এই জটিল আর্থিক প্রবাহ কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেই সচল রাখছে না, বরং এর মাধ্যমে দেশটির কৌশলগত সামরিক কর্মসূচির কাঁচামাল সংগ্রহের পথও উন্মুক্ত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি আমদানিকারকেরা ছোট ও আন্তর্জাতিকভাবে কম পরিচিত বিদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করছে, যার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ইরানের বহুল আলোচিত শাহেদ ড্রোন নির্মাণে।

 

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ইরানের ওপর লাগাতার আর্থিক বিধিনিষেধ চাপাতে গিয়ে ওয়াশিংটন এখন এক গভীর কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি। করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে বিশ্বজুড়ে ডলারের কেন্দ্রীয় গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমশ ইউয়ান ও অন্যান্য স্থানীয় মুদ্রার দিকে ধাবিত হতে পারে।

 

ফলে একদিকে তেহরানের অর্থপ্রবাহের পথ রুদ্ধ করা এবং অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখা-এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন হোয়াইট হাউসের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া