রবিবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাসান রুহানির মন্তব্য ঘিরে ইরানে তীব্র সমালোচনা, 'মূল সংঘাত প্রতিরোধ ও আত্মসমর্পণের'

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:১২ পিএম

হাসান রুহানির মন্তব্য ঘিরে ইরানে তীব্র সমালোচনা, 'মূল সংঘাত প্রতিরোধ ও আত্মসমর্পণের'
ছবি : Collected

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য এই বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

 

তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, ইরানের জনগণ পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে আরও ২০ বছর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত কি না। তাঁর এই মন্তব্যের পর ইরানের রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

 

সমালোচকদের মতে, পশ্চিমাদের সঙ্গে আপস বা যুদ্ধের এই দ্বৈত সমীকরণ দাঁড় করানোর আগে রুহানির উচিত তাঁর শাসনামলের আট বছরের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতাগুলোর দায়ভার গ্রহণ করা।

 

বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত আস্থা স্থাপন, তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং পরমাণু চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো দেশবাসীর সামনে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

 

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের সাবেক প্রধান আলাউদ্দিন বোরুজেরদি হাসান রুহানির এই মন্তব্যের অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেছেন। বোরুজেরদির মতে, পরিস্থিতিকে '২০ বছরের যুদ্ধ নাকি অন্য কোনো শান্তির পথ' হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

 

তিনি দাবি করেন, যখন আগ্রাসী পরাশক্তিগুলো ক্রমাগত শত্রুতা করে যাচ্ছে, তখন তাদের আচরণকে পাশ কাটিয়ে এমন প্রশ্ন তুললে মূল সমস্যার দিকটিই হারিয়ে যায়। তাঁর মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের বর্তমান যে দ্বন্দ্ব, তার মূল ভিত্তি কোনো সাধারণ যুদ্ধ বা শান্তি নয়, বরং এটি হলো 'প্রতিরোধ এবং আত্মসমর্পণের' মধ্যকার সংঘাত।

 

আগ্রাসনের মুখে মাথা নত না করে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। এই বিতর্কে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ গাঞ্জি সাবেক প্রেসিডেন্টকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।

 

তিনি জানতে চেয়েছেন, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়াতে রুহানি যে 'অন্য পথের' ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তার প্রকৃত অর্থ আসলে কী? এই অন্য পথ কি ইরানের বৈধ পারমাণবিক অধিকার, জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ পিছু হটার নামান্তর?

 

প্রতিপক্ষ যখন দিনের পর দিন নতুন নতুন অযৌক্তিক শর্ত ও দাবি চাপিয়ে দিচ্ছে, তখন তাদের সেই চাপ মেনে নিয়ে আরও ছাড় দেওয়াকেই কি শান্তির পথ বলা হচ্ছে? গাঞ্জির এই প্রশ্নগুলো ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানেরই প্রতিফলন ঘটায়।

 

একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক জাভাদ বাখশি-আলমোতি এই আপসকামী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের যেসব নেতা অতীতে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে যেকোনো মূল্যে সমঝোতা করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির স্বাক্ষরকে একটি চূড়ান্ত ও অকাট্য নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, আজ তাদের সেই নীতির ভয়াবহ পরিণতির জন্য জবাবদিহি করা উচিত।

 

কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, তারা নিজেদের সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভুল ও ব্যর্থতার দায় স্বীকার করার পরিবর্তে উল্টো জনগণকে যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে জনমতকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এটি জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা বলে তিনি মনে করেন।

 

ইরানের পরমাণু চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন, লুসান এবং সাদাবাদের ঐতিহাসিক আলোচনার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আমিন সোলেইমি।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসাটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, যাদের অতীতে বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের একটি দীর্ঘ ও প্রমাণিত ইতিহাস রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যাটি তখনই সৃষ্টি হয়, যখন একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও প্রতিপক্ষ তাদের আগ্রাসী অবস্থান থেকে সরে আসে না এবং উল্টো নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকি অব্যাহত রাখে। পশ্চিমাদের এই দ্বিমুখী আচরণের কারণেই তাদের সঙ্গে নতুন করে কোনো 'অন্য পথে' হাঁটার সুযোগ নেই বলে তিনি যুক্তি তুলে ধরেন।

 

পুরো বিষয়টিকে একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু তীক্ষ্ণ উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত গণমাধ্যমকর্মী মোহাম্মদ আকবরজাদে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির যুক্তির অসারতা প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, কোনো সশস্ত্র ও আগ্রাসী ব্যক্তি যদি জোরপূর্বক আপনার বসতঘরে প্রবেশ করে এবং আপনার পরিবারের ওপর হামলা চালায়, তখন কি আপনি প্রথমেই পরিবারের সদস্যদের ডেকে জিজ্ঞেস করবেন যে, 'আমরা কি এখন নিজেদের আত্মরক্ষা করব, নাকি করব না?'

 

অর্থাৎ, যখন জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে, তখন প্রতিরোধের বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটাই একটি অবাস্তব ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ। আত্মরক্ষা একটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার, যার জন্য কোনো আপসের প্রশ্নই ওঠে না।

 

পরিশেষে বলা যায়, হাসান রুহানির মন্তব্য ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পুরোনো অথচ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিতর্কটিকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে যে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানের নীতি কী হওয়া উচিত।

 

একদিকে রয়েছে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশা, আর অন্যদিকে রয়েছে জাতীয় আত্মমর্যাদা, সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রেখে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ বিতর্ক প্রমাণ করে যে, পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস দেশটির নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে, যা সহসাই দূর হওয়ার নয়।

 

- পার্সটুডে