সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ, ট্রাম্পের দাবি ভিত্তিহীন: মোহসেন রেজায়ির কড়া বার্তা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১৮ পিএম

হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ, ট্রাম্পের দাবি ভিত্তিহীন: মোহসেন রেজায়ির কড়া বার্তা
ছবি : Collected

বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এই প্রণালি উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকার যে দাবি করেছিলেন, তাকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও ‘মস্ত বড় মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি।

 

মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার এমন বিবৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের একটি বিশেষ সংবাদ অনুষ্ঠানে হরমুজ প্রণালির সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন।

 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ওই কৌশলগত জলপথে বর্তমানে কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকার স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে জাহাজ চলাচলের যে স্বাভাবিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মোহসেন রেজায়ি জানান, নৌপথটির মূল অংশ ব্যবহার করতে না পেরে বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ওমানের পাথুরে উপকূল ঘেঁষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করে কয়েকটি জাহাজ নিজেদের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে, যাতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। তবে অত্যন্ত দুর্গম ও বিপজ্জনক এই পথে চলতে গিয়ে বেশিরভাগ জাহাজই মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

 

এমন পরিস্থিতিতে ইরান কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারলেও, পরিবেশগত মারাত্মক বিপর্যয়ের কথা বিবেচনা করে তেহরান আপাতত এসব দিশেহারা জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সচেতনভাবে বিরত রয়েছে। তবে এই নমনীয়তা চিরস্থায়ী নয় বলেও তিনি প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর ঘিরে নিজেদের কৌশলগত আধিপত্য আরও সুসংহত করতে নতুন পদক্ষেপের কথাও ঘোষণা করেছে ইরান। মেজর জেনারেল রেজায়ি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, খুব শিগগিরই এই অঞ্চলে একটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ অঞ্চল ঘোষণা করা হবে।

 

আগামী দিনগুলোতে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিধি মার্কিন অবরোধরেখা থেকে শুরু করে পণ্য ওঠানামার প্রধান বন্দরগুলো পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হবে। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলকারী সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি সতর্ক করে তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে যথাযথ পূর্ব-সমন্বয় না করে এই সংবেদনশীল অঞ্চলে চলাচলকারী যেকোনো দেশি বা বিদেশি জাহাজকে ইরানের নিজস্ব নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

 

একবার এই তালিকায় নাম উঠলে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিমা সুবিধা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হতে পারে এবং তাদের অবাধ চলাচলের ক্ষেত্রে নানাবিধ আইনি ও কাঠামোগত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সৃষ্টি হবে।

 

তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক এই নতুন নীতি মূলত ইরানের কৌশল পরিবর্তনের প্রথম সুস্পষ্ট পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও তীব্র চাপ প্রয়োগ করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ধসে পড়বে এবং দেশটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে-এমন ধারণাকে সম্পূর্ণ অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

 

তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, সম্ভাব্য যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য ইরানের বর্তমান সরকার আগে থেকেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও নিশ্ছিদ্র প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছে।

 

দেশটিতে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী এবং কৌশলগত রসদের পর্যাপ্ত ও নিরাপদ মজুত রয়েছে, যা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি যেকোনো অবরোধ অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির ক্ষেত্রে ইরান যে অভাবনীয় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, অবরোধের আগেই পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে উৎপাদন করে মজুত রাখা প্রায় সাত থেকে আট কোটি ব্যারেল তেল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই অঞ্চল থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

 

বর্তমানে সেসব মজুতকৃত তেল অত্যন্ত সফলভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ, একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য মজুত সম্পূর্ণ স্থিতিশীল ও সুরক্ষিত রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে বিকল্প উপায়ে তেল বিক্রির ধারাও নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে, যা মার্কিন অবরোধের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

সামরিক সংঘাতের কৌশলগত পরিবর্তন এবং মার্কিন অবরোধের সরাসরি জবাব দেওয়ার অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন রেজায়ি। তিনি জানান, চলমান এই বারো দিনের সংঘাতের একেবারে শুরুর দিকে ইরান প্রথমবারের মতো একটি অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল একটি সতর্কতামূলক হামলা পরিচালনা করেছে।

 

এই হামলার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনকে মূলত এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, সমুদ্রপথে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করার চেষ্টা কখনোই ঝুঁকিমুক্ত নয় এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক আধিপত্যেরও যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।

 

পরিশেষে, পশ্চিমা বিশ্বের অবরোধ স্থায়ীভাবে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইরান যে যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, সেটির ওপরও তিনি বিশেষভাবে আলোকপাত করেন।

 

পনেরোটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিস্তৃত ও সুরক্ষিত স্থলসীমান্ত থাকা সত্ত্বেও ইরান দীর্ঘকাল ধরে কেবল সমুদ্রপথনির্ভর বাণিজ্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল। সেই নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, এখন সমুদ্রপথের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক বাণিজ্যিক করিডোরগুলোকে সর্বাত্মকভাবে সক্রিয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা আগামী দিনে ইরানের অর্থনীতিকে একটি টেকসই ও অজেয় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

 

- পার্সটুডে