সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নিয়ে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ইরান!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নিয়ে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ইরান!
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে চলমান সামরিক অচলাবস্থা নিরসনে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন একটি নৌপথ চালুর চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ইরান।

 

তবে একই সঙ্গে তেহরান এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব ধরনের সামরিক হামলা ও শত্রুতামূলক তৎপরতা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না।

 

গত রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, প্রস্তাবিত নতুন এই নৌপথ ব্যবহার করে কোন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ প্রবেশ করবে এবং কোনটি বের হবে, সেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল তেহরানের হাতেই ন্যস্ত থাকবে।

 

বর্তমানে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে ইরানের নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই নতুন পথের কিছু অংশ উভয় দেশের নিজস্ব জলসীমার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবে।

 

উল্লেখ্য, বর্তমানের এই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।

 

সামরিক সংঘাতের কারণে ওই পথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে নৌপথটি পুনরায় চালু করার এই কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্ট দুই দেশ।

 

শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের সামরিক আগ্রাসন এবং ইরানের দৃষ্টিতে অন্তর্ঘাতমূলক বলে বিবেচিত সব ধরনের ধ্বংসাত্মক অপতৎপরতা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকে, তবেই কেবল তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা প্রদান করবে।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি গত জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর মতে, ওই চুক্তির মূল দুর্বলতা ছিল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তার চরম অভাব। এমনকি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোও সেই সমঝোতা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।

 

ওই চুক্তির প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের প্রধান দায়িত্ব ছিল ইরানের ওপর থেকে আরোপিত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া। বিপরীতে তেহরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করা।

 

কিন্তু বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট মতবিরোধের জেরে শেষ পর্যন্ত সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত চুক্তিটি ভেঙে যায়। নতুন নৌপথ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও রেজাই জোর দিয়ে দাবি করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালি কার্যত ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ অবস্থাতেই রয়েছে।

 

প্রতিদিন এই বিশাল জলপথ দিয়ে সর্বোচ্চ সাত থেকে আটটি জাহাজ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে, যার মধ্যে পাঁচ-ছয়টি জাহাজই সরাসরি ইরানের নিত্যপ্রয়োজনীয় নিজস্ব পণ্য বহনকারী। তিনি জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী মাঝেমধ্যে ওমানের কাছাকাছি জলসীমা ব্যবহার করে কয়েকটি জাহাজকে পারাপারে সহায়তা করার চেষ্টা করে থাকে।

 

তবে ওই জাহাজগুলো প্রায়শই সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অক্ষত অবস্থায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। এমন একটি বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল চলাচলকে কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় জলপথটির বর্তমান উন্মুক্ত অবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে প্রতিনিয়তই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেজাই সতর্ক করে জানান, ইরান অত্যন্ত শিগগিরই হরমুজ প্রণালির আশপাশের একটি সুনির্দিষ্ট এলাকাকে ‘নিয়ন্ত্রিত এলাকা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে।

 

নতুন এই নিয়মের আওতায় ওই নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশকারী যেকোনো অননুমোদিত জাহাজকে সরাসরি ইরানের কঠোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তেহরানের পূর্বানুমতি ছাড়া সেসব জাহাজ আর কখনোই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে না।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইরান এই কৌশলগত জলপথে নিজেদের বিধিনিষেধ আরও সুসংহত ও কঠোর করছে। তাঁর দাবি, প্রণালিতে তেহরানের আরোপ করা এই কাঠামোগত নিষেধাজ্ঞার সুদূরপ্রসারী প্রভাব শেষ পর্যন্ত ইরানের প্রত্যক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সামরিক প্রভাবের চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

 

সামরিক উত্তেজনার পারদ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে রেজাই জানান, মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে ইরান প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানের বিরুদ্ধে সফলভাবে পরীক্ষা করেছে।

 

মূলত দুই পরাশক্তির মধ্যে নতুন করে সমুদ্রপথে প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটেই তাঁর এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যগুলো সামনে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড বা সেন্টকম গত শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দুটি মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করে সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর, মার্কিন বাহিনী আত্মরক্ষার্থে এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে সরাসরি হামলা চালিয়েছে।

 

মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে চরম অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হলেও, মোহসেন রেজাই এই সংঘাতের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবকে অত্যন্ত কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ইরানের কাছে বর্তমানে খাদ্য ও অন্যান্য সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত রয়েছে।

 

একই সঙ্গে দেশটি এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে বিকল্প উপায়ে তেল বিক্রি অব্যাহত রেখেছে এবং রপ্তানি করা তেলের অর্থও নিয়মিত হাতে পাচ্ছে। তিনি এমন এক সময়ে এই আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য করলেন, যখন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধের কারণে দেশটির অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ তেল রপ্তানি অত্যন্ত আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, ইরান সরকারের রাষ্ট্রীয় রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম উৎসই হলো এই তেল রপ্তানি খাত, যা বর্তমানে চরম হুমকির সম্মুখীন।