সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হুঁশিয়ারি তেহরানের

ইরানের মানচিত্রে নিজের অবয়ব বসিয়ে ট্রাম্পের উসকানি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

ইরানের মানচিত্রে নিজের অবয়ব বসিয়ে ট্রাম্পের উসকানি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক তৎপরতা জোরদার করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি কোনো নতুন সামরিক অভিযান না চালালেও ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-প্রযুক্তির তৈরি বেশ কিছু উসকানিমূলক ছবি প্রকাশ করে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছেন।

 

একটি বিতর্কিত ছবিতে ইরানের মানচিত্রের ওপর নিজের মুখের অবয়ব বসিয়ে তিনি কার্যত দেশটিকে নিশ্চিহ্ন করার এবং ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন।

 

একই সঙ্গে ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপে হামলার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে তিনি চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের এই আচরণকে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি নতুন মাত্রার ডিজিটাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তাগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল পরিবহন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

 

তাঁর ভাষ্যমতে, এই সংকীর্ণ ও কৌশলগত জলপথ দিয়ে বর্তমানে দৈনিক এক কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছে, যা সংঘাতপূর্ব সময়ের দৈনিক দুই কোটি ব্যারেলের অত্যন্ত কাছাকাছি।

 

ট্রাম্প এমন এক সময়ে এই দাবি উত্থাপন করলেন, যখন বৈশ্বিক তেল সরবরাহের মূল ধমনি হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে অচলাবস্থা সৃষ্টির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির চরম আশঙ্কা বিরাজ করছে।

 

একই সঙ্গে তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। ট্রাম্পের প্রকাশ করা তথ্যে দাবি করা হয় যে, দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় ধসে পড়েছে এবং অতি-মুদ্রাস্ফীতির কারণে জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

 

সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান যেখানে ছিল প্রায় নয় লাখ, তা সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ডলারপ্রতি ২২ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

 

ইরানের স্পর্শকাতর তেল অবকাঠামোগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প একের পর এক বিতর্কিত বার্তা প্রচার করেছেন। তাঁর শেয়ার করা একটি নাটকীয় ডিজিটাল চিত্রে দেখা যায়, একটি যুদ্ধবিমান সরাসরি তেলকূপে বোমা বর্ষণ করছে এবং তার ক্যাপশনে লেখা রয়েছে "বিদায়, খার্গ"।

 

খার্গ দ্বীপ মূলত ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় সেখানে যেকোনো ধরনের আঘাত দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

এর মাত্র কয়েক দিন আগে হরমুজ প্রণালির নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ রাখার অবাস্তব প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি, যদিও পরবর্তীতে এটিকে সাধারণ কৌতুক হিসেবে অভিহিত করে লঘু করার চেষ্টা করেন।

 

তা সত্ত্বেও, একটি সার্বভৌম দেশের মানচিত্রে নিজের মুখাবয়ব বসিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণের এই নজিরবিহীন ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মৌলিক শিষ্টাচারকে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এহেন উসকানিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতির কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হবে না, বরং যেকোনো আগ্রাসনের মুখে রণক্ষেত্রে চরম প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

 

চলমান সংঘাত নিরসনে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত এক ভাষণে জানিয়েছেন, অতীতে প্রতিপক্ষের হামলার সমপরিমাণ বা আনুপাতিক পাল্টা জবাব দেওয়ার যে রীতি ছিল, তার চিরসমাপ্তি ঘটেছে।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যেকোনো আঘাত এলে তার উত্তর দেওয়া হবে দ্রুততম সময়ে, আরও তীব্র ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক উপায়ে।

 

একই সাথে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর আধিপত্য ও আগ্রাসী তৎপরতা প্রতিহত করতে আগামী দিনে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় একটি সুনির্দিষ্ট 'নিষিদ্ধ অঞ্চল' কার্যকর করা হবে।

 

মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধরেখা থেকে শুরু করে পণ্য খালাসের বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এই বিধিনিষেধ। রেজায়ি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তেহরানের পূর্বানুমতি ও সমন্বয় ব্যতিরেকে সেই সংবেদনশীল জলসীমায় প্রবেশকারী যেকোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজকে সরাসরি ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট নৌযানগুলো আন্তর্জাতিক বিমা সুবিধা ও আইনগত বৈধতা হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে।

 

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যে সর্বাত্মক সংঘাতের সূচনা করেছিল, তার জবাবে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই নৌপথে নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করে ইরান।

 

দীর্ঘ এক মাস পর সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনী পুনরায় ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালালে দুই পরাশক্তির মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ-সংঘর্ষ শুরু হয়। ফলে একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ এবং অন্যদিকে রণক্ষেত্রে ইরানের সরাসরি বিধিনিষেধ আরোপের হুমকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বনাশা যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

 

- এনডিটিভি