সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননের উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্ত এলাকা থেকে নিজ দেশে ফিরে আসার পর এক ইসরায়েলি সেনার আত্মহত্যার ঘটনা এই মানসিক বিপর্যয়ের দিকটিই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জানা গেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত কিরিয়াত গাত নামক এলাকার একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে ওই সেনার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্ত ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনাটি একটি সুস্পষ্ট আত্মহত্যার ঘটনা। তবে নিহত ওই সেনার নাম, পরিচয়, বয়স বা সামরিক পদবি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, সংবেদনশীলতার জায়গা থেকে সামরিক বিধিনিষেধের কারণে পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বজুড়েই বর্তমানে গভীর উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে বা চরম উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে দিনের পর দিন দায়িত্ব পালন করেন।
সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে এবং ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জানা গেছে, দক্ষিণ লেবাননে সামরিক দায়িত্ব পালনকালে ওই সেনা চরম মানসিক অবসাদ বা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের মতো জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন।
লেবানন সীমান্তে চলমান তীব্র উত্তেজনা, প্রতিনিয়ত যুদ্ধের দামামা এবং যেকোনো মুহূর্তে প্রাণঘাতী হামলার আশঙ্কা সামরিক সদস্যদের ওপর যে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, এই আত্মহত্যার ঘটনা তারই একটি মর্মান্তিক পরিণতি বলে মনে করছেন সামরিক ও চিকিৎসা বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা সেনাদের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক বৈকল্য একটি অত্যন্ত সাধারণ অথচ গুরুতর সমস্যা। যথাযথ মানসিক পরামর্শ, নিবিড় পরিচর্যা বা চিকিৎসার অভাব এই ধরনের চরম পরিণতির দিকে একজন যোদ্ধাকে ঠেলে দিতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন।
এই আত্মহত্যার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইসরায়েল এবং লেবানন সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তের দুপাশে গোলাগুলি, চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং অনুপ্রবেশের মতো ভীতিকর ঘটনা ঘটছে, যা ওই অঞ্চলকে একটি সক্রিয় ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য এই রণাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করা কেবল শারীরিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং মানসিকভাবেও চরম বিপর্যয়কর। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক মাস ধরে এই অঞ্চলে সামরিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে।
আকাশপথে অবিরাম নজরদারি, দূরপাল্লার গোলাবর্ষণ এবং আকস্মিক গেরিলা আক্রমণের আতঙ্কে এই এলাকার পরিবেশ সর্বদাই থমথমে থাকে। এমন একটি ভীতিকর ও অনিশ্চিত পরিবেশে দিনের পর দিন কাটানো যেকোনো মানুষের জন্যই চরম মানসিক পরীক্ষার বিষয়।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রের ঝনঝনানির চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হতে পারে একজন সেনার ভেতরের নিঃশব্দ মানসিক রক্তক্ষরণ। মানসিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি শারীরিক ক্ষয়ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছে নিয়মিত।
আত্মহত্যার এই মর্মান্তিক খবরের পাশাপাশি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করেছে। তাদের দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের কেল্লা আল-শাকিফ নামক কৌশলগত এলাকায় গত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নতুন করে সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এই সংঘর্ষের সময় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর এক সদস্যের লক্ষ্যবস্তু করা নিখুঁত গুলিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অন্যতম পরিচিত ও অভিজাত শাখা ‘গোলানি ব্রিগেড’-এর দুই সেনা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
গোলানি ব্রিগেডকে ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনীর অন্যতম সুশৃঙ্খল, সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধরনের একটি প্রথম সারির অভিজাত ইউনিটের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা এবং তাতে তাদের গুরুতর আহত হওয়া সামরিক বাহিনীর সার্বিক মনোবলের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিরিয়াত গাত এলাকায় সেনার আত্মহনন এবং কেল্লা আল-শাকিফে অভিজাত বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনাগুলো ইসরায়েলি সামরিক কাঠামোর ভেতরের একটি নাজুক ও ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরছে।
একদিকে সম্মুখ সমরের রক্তক্ষয়ী ও নির্মম বাস্তবতা, অন্যদিকে সেনাদের নীরবে বয়ে বেড়ানো দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণা-এই দুইয়ে মিলে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
আধুনিক যুগে যুদ্ধাস্ত্রের ও প্রযুক্তির যতই উন্নতি হোক না কেন, মানুষের মনের ওপর যুদ্ধের যে ভয়াবহ ও চিরস্থায়ী ধ্বংসাত্মক আঁচড় পড়ে, তা কোনো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেই নিরাময় সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধের এই অদৃশ্য ক্ষতের বিষয়ে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে আসছে। এই চলমান সংঘাত কেবল সামরিক সক্ষমতারই পরীক্ষা নিচ্ছে না, বরং মানুষের মানসিক সহনশীলতার শেষ সীমানাকেও বারবার চ্যালেঞ্জ করছে।