উদ্ভূত এই জটিল ও সংকটময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিজস্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি রপ্তানি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সম্পূর্ণ নতুন ও বিকল্প বাণিজ্যিক পথ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির নীতিনির্ধারকেরা অনুধাবন করছেন যে, হরমুজ প্রণালির ওপর একক নির্ভরতা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
তাই এই নৌপথটি সযত্নে এড়িয়ে নির্বিঘ্নে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পৌঁছে দিতে নিজেদের পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন জ্বালানি পরিবাহী পথ বা পাইপলাইন স্থাপন, রেলপথের আধুনিকায়ন এবং বিকল্প বাণিজ্যিক পথের ব্যাপক সম্প্রসারণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে এই যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। এই বিকল্প পথ নির্মাণের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি রাজধানী আবুধাবিতে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।
তাঁর সেই বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান কূটনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার এক গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে। আনোয়ার গারগাশ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যতে হয়তো একটি কার্যকর ও স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তা অবশ্যই করতে হবে।
তবে, গত কয়েক মাস ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর যে ধারাবাহিক ও অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা আঞ্চলিক আস্থার ভিত্তিকে চরমভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাই, কেবল সম্পর্ক স্থাপন করলেই হবে না, বরং প্রতিবেশীদের মধ্যে সেই হারানো পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়।
তিনি আক্ষেপ করে জানান, এই গভীর ক্ষত নিরাময় করে পুনরায় আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে সম্ভবত কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তার স্বার্থে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আনোয়ার গারগাশ তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন যে, চলমান উত্তেজনার কারণে গত আগস্ট মাসেই সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করার মতো একটি কঠিন ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের আগ্রাসী পদক্ষেপের প্রতিবাদ হিসেবেই এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তবে, এই সম্মেলনে তিনি কেবল ইরানেরই সমালোচনা করেননি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্মিলিত দুর্বলতার দিকটিও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
ইরানের একের পর এক হামলার বিরুদ্ধে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সম্মিলিত ও যৌথ প্রতিক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংকটময় মুহূর্তে মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে যে ধরনের ঐক্যবদ্ধ ও জোরালো পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ছিল, তা বাস্তবায়নে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
গারগাশ তাঁর কূটনৈতিক বিশ্লেষণের গভীরে গিয়ে বলেন, ইরান বহু বছর ধরেই এই অঞ্চলের জন্য একটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে আসছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নীতিনির্ধারকেরা এই চ্যালেঞ্জের প্রকৃতি ও ভয়াবহতা সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরেই মোটামুটি একমত ছিলেন।
সুতরাং, নিজেদের মধ্যে সমস্যা অনুধাবন করা বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অভাব বা ঘাটতি ছিল না। কিন্তু, এই ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলো যে জায়গায় সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তা হলো নিজেদের এই পারস্পরিক বোঝাপড়াকে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং কার্যকর কৌশলগত প্রতিক্রিয়ায় রূপান্তরিত করতে না পারা।
সময়ের দাবি অনুযায়ী সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার কারণেই আজ এই অঞ্চলকে এমন এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। পরিশেষে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই নতুন কৌশলগত পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি কূটনীতিতে একটি বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির মতো একটি সংবেদনশীল ও সংঘাতপ্রবণ নৌপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পূর্ব উপকূলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, দেশটি ভবিষ্যৎ যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে বদ্ধপরিকর।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিকল্প সরবরাহ পথ নিশ্চিত হলে তা কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করবে না, বরং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।