মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই বাগযুদ্ধ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে জানিয়েছে, মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় ইরানি প্রেসিডেন্ট এই কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেন।
একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বার্তায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মূলত ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ এবং প্রতিরক্ষামূলক দর্শনের রূপরেখা তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, নীতিগতভাবে ইরান কখনই কোনো ধরনের সংঘাত কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের বিস্তার সমর্থন করে না। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষাকে তেহরান সর্বদাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।
কোনো পক্ষকে অযথা উসকানি দেওয়া কিংবা এলাকায় অশান্তির আগুন প্রজ্বলিত করা ইরানের নীতিবিরুদ্ধ বলেই তিনি দাবি করেন। তবে শান্তির প্রতি এই অনুরাগকে দুর্বলতা ভাবার কোনো অবকাশ নেই বলেও তিনি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে দেন।
জাতীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে তেহরান কূটনীতির পথ খোলা রাখার পাশাপাশি যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাব দিতে সমানভাবে প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের অতীত সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, অতীতেও যখনই কোনো আগ্রাসী শক্তি ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার অপচেষ্টা চালিয়েছে, তখনই এ দেশের সাহসী জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং মাতৃভূমি রক্ষায় আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতেও সেই একই প্রতিরোধমূলক চেতনা কার্যকর রয়েছে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, যারা ইরানের ওপর সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক আগ্রাসন চাপিয়ে দিতে চায়, তারা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করে সম্পূর্ণরূপে অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিরোধ শক্ত হাতে জারি রাখা হবে।
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো অবস্থাতেই নতজানু হবে না, বরং তা যেকোনো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বেশি সংহত ও শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের মতে, ইরানি জনগণের সামগ্রিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ করা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক এবং নৈতিক দায়িত্ব।
মার্কিন প্রশাসনের অব্যাহত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বৈরিতা এবং সামরিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও প্রতিরক্ষা কাঠামো সুদৃঢ় রাখা এখন তেহরানের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
ওয়াশিংটনের তরফ থেকে দেওয়া বিভিন্ন আক্রমণাত্মক বক্তব্যের বিপরীতে ইরানের এই কড়া প্রতিক্রিয়া বিশ্বমঞ্চে তেহরানের অনমনীয় অবস্থানকেই আবারও তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া মনোভাবের পাল্টায় পেজেশকিয়ানের এই বার্তা স্পষ্ট সংকেত দেয় যে, যেকোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ বা সামরিক আগ্রাসনের মুখে ইরান নিজেদের প্রতিষ্ঠিত নীতি থেকে একচুলও সরে আসবে না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূকৌশলগত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের স্বাভাবিক চলাচল এবং বিদ্যমান কূটনৈতিক অমীমাংসিত বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপটে উভয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এমন অনমনীয় বক্তব্য আঞ্চলিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংকট নিরসনে সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং পারস্পরিক আস্থা ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক পথ উন্মুক্ত রাখাই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়ানোর একমাত্র উপায় হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। তবে বৈরিতা দূর না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক টানাপোড়েন অব্যাহত থাকবে।