এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক একটি সামরিক ঘোষণা। গাজার ধ্বংসযজ্ঞের পর এবার ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীর এলাকায় ‘পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ’ শুরু করার এক কঠোর ও প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আগ্রাসী বিবৃতি পুরো অঞ্চলের নাজুক শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও বেশি হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইসরায়েলি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই বার্তা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই ধরনের হুমকির তীব্র সমালোচনা করে এর সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক দীর্ঘ ও সতর্কতামূলক বার্তায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী তার দেশের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ইসরায়েল কাৎজ তার বিবৃতিতে বলেন, যদি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং ওই অঞ্চলে থাকা ইহুদি বসতিগুলোর ওপর গত ৭ই অক্টোবরের মতো কোনো ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা করে, তবে তার পরিণতি হবে ভয়ংকর।
এমনকি ইসরায়েলি গোয়েন্দারা যদি আগে থেকেই এমন কোনো হামলার প্রস্তুতির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পায়, তবে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে পশ্চিম তীরে সরাসরি পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু করা হবে।
তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তিনি যৌথভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার ও প্রয়োজনীয় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশ ইতোমধ্যে প্রদান করেছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪ নিউজের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযানের একটি বিস্তারিত খসড়া বা ব্লুপ্রিন্ট ইতোমধ্যে প্রস্তুত করে ফেলেছে আইডিএফ।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, যদি কোনো কারণে সত্যিই সংঘাত বেধে যায়, তবে ইসরায়েলি বাহিনীর মূল লক্ষ্যবস্তু হবে পশ্চিম তীরে ক্ষমতাসীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।
এর পাশাপাশি পশ্চিম তীরের গুরুত্বপূর্ণ সব সরকারি ভবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোগত স্থাপনাগুলোতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পূর্বপরিকল্পনা ছকে রাখা হয়েছে।
এই ধরনের সুপরিকল্পিত আক্রমণ মূলত ফিলিস্তিনি প্রশাসনের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত মেরুদণ্ড সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তার বার্তায় সম্ভাব্য এই যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই পূর্ণ মাত্রার সামরিক অভিযানের আওতায় সুনির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক পরিসরে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের বাস্তুচ্যুত করা এবং ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যাবতীয় সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা সমূলে ধ্বংস করার মতো নির্দয় পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পরিস্থিতি নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। কাৎজ তার এই নতুন সামরিক কৌশলকে গাজা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর তৈরি করা নিরাপত্তা বলয় এবং অতীতে জেনিনসহ উত্তর পশ্চিম তীরে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করেছেন।
ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, অতীতে বছরের পর বছর ধরে চলা ইন্তিফাদার মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে ইসরায়েল আর জড়াবে না, বরং চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই যেকোনো হুমকির দ্রুত অবসান ঘটানো হবে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই চরম আক্রমণাত্মক বিবৃতিটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিম তীরে নতুন করে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলীয় শহর নাবলুসের কাছে একটি আকস্মিক ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।
মূলত এই ঘটনার পরপরই মঙ্গলবার কাৎজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ওই কড়া হুঁশিয়ারি বার্তাটি প্রকাশ করেন। নাবলুসের এই হামলা প্রসঙ্গে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্টে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উসারিন নামক এলাকার কাছে ছুরি হাতে এক ফিলিস্তিনি হামলাকারী অতর্কিতভাবে একজন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিককে আঘাত করে এবং দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এই ঘটনার পরপরই ওই অঞ্চলে চরম সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আইডিএফ জানিয়েছে, হামলাকারীকে ধরতে ইতোমধ্যে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলি সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সেনাবাহিনী সন্দেহভাজন হামলাকারীর পিছু ধাওয়া করার পাশাপাশি আশেপাশের বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি গ্রাম পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের ওপরও কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, গাজা উপত্যকার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও সংঘাতের নতুন দাবানল ছড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই ভূখণ্ডগত দ্বন্দ্বের নতুন মাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত, যা আরব নিউজসহ বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।