যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক আক্রমণের পরপরই পাল্টা জবাব হিসেবে জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত প্রভাবশালী শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নজিরবিহীন সংঘাত ওই অঞ্চলের বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই সামরিক অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছে।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গত রোববার এবং সোমবার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে টহলরত মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান একাধিক ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।
ইরানের সেই উসকানিমূলক আচরণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই মার্কিন বাহিনী এই পাঁচটি ইরানি ট্যাংকারকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। যে পাঁচটি ট্যাংকার জাহাজকে লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে, সেন্টকম তাদের নামও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে।
এই জাহাজগুলো হলো এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন ১, এম/টি রিয়েস্কো এবং এম/টি দেরিয়া। সেন্টকমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই জাহাজগুলোর মধ্যে প্রথম চারটি ওমান সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল এবং পঞ্চমটি ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপের কাছাকাছি নোঙ্গর করা ছিল।
এই অতর্কিত হামলায় জাহাজগুলোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হলেও কোনো নাবিক বা ক্রু সদস্য হতাহত হননি। কারণ, মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত সুকৌশলে জাহাজগুলোতে চূড়ান্ত আঘাত হেনে সেগুলোকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দেওয়ার আগেই ভেতরে থাকা সকল ক্রু সদস্যকে অবিলম্বে জাহাজ ত্যাগ করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছিল।
পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল আইআরআইবি তাদের সম্প্রচারিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে ট্যাংকার জাহাজে মার্কিন বাহিনীর এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, এই ঘটনার পর ইরানও নীরব থাকেনি।
জর্ডানের আল আজরাক অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ইরানের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হেনেছে এবং এর সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবেই জর্ডানের ওই মার্কিন ঘাঁটিতে এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের নিজস্ব এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, ইরানের সেনাবাহিনী আল আজরাক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও তাদের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক সহায়তায় অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই মাঝপথে আটকে দিয়ে সফলভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
জর্ডানের সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা তাদের আকাশসীমার সার্বভৌমিকতা রক্ষায় সর্বদা বদ্ধপরিকর এবং যেকোনো ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে তাদের বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে। এর পাশাপাশি, সেন্টকম তাদের এক্স বার্তায় হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার যে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে সেই ঘটনার দায়ও নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েছে।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোর দিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের নিক্ষিপ্ত নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ ইউএস নেভি ডিডিজি-১১৯ এবং ইউএস নেভি ডিডিজি-৫৩ এর মারাত্মক ও অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দুই প্রধান মিত্র রাষ্ট্র কুয়েত এবং বাহরাইনের বন্দরগুলোতেও যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছে ইরানের এই রেভল্যুশনারি গার্ড কোর।
তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, কুয়েত ও বাহরাইনের বিভিন্ন বন্দরে বর্তমানে অবস্থানরত সকল তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজের ক্রুদের অবিলম্বে সতর্ক করা হচ্ছে। জাহাজগুলো নোঙ্গর করা অবস্থায় থাকুক কিংবা বন্দরে অবস্থান করুক, তারা যেন নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে দ্রুততার সঙ্গে জাহাজ ত্যাগ করেন।
কারণ, এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে যেকোনো মুহূর্তে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে প্রাপ্ত এই সংবাদ পুরো বিশ্বজুড়ে চরম সামরিক উত্তেজনার পূর্বাভাস দিচ্ছে। বিশ্বনেতারা এখন নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ এই সংঘাত বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।