মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
যুদ্ধের চরম মাশুল

বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও গবেষণার মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে একঘরে হচ্ছে ইসরায়েল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও গবেষণার মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে একঘরে হচ্ছে ইসরায়েল
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং সামরিক আগ্রাসনের কারণে ইসরায়েল বর্তমানে কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবেই নয়, বরং বৈশ্বিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণার বিস্তৃত মঞ্চ থেকেও চরমভাবে একঘরে হয়ে পড়ছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বড় বড় গবেষণা তহবিল থেকে ইসরায়েলের প্রাপ্ত অনুদানের পরিমাণ যেমন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, ঠিক তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খ্যাতনামা গবেষকরাও ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে প্রকাশ্যেই অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।

 

দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে নিজেদের জাতীয় শক্তিমত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিশ্বের বুকে সগর্বে তুলে ধরেছে ইসরায়েল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানে তাদের অব্যাহত সামরিক তৎপরতার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তারই একটি নীরব অথচ অত্যন্ত গভীর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির বৈজ্ঞানিক অঙ্গনে।

 

ইসরায়েলের প্রভাবশালী ও স্বনামধন্য গণমাধ্যম ‘ক্যালকালিস্ট’-এর এক সাম্প্রতিক বিশদ প্রতিবেদনে দেশটির বিজ্ঞান ও গবেষণা খাতের এই ক্রমবর্ধমান সংকটের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

ক্যালকালিস্ট-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা আজ বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব নীরব বয়কটের শিকার হচ্ছেন। ইউরোপসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলি শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের সুস্পষ্ট অনীহা ও প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

 

এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থী এবং প্রগতিশীল শিক্ষকরা ইসরায়েলের বর্তমান যুদ্ধনীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।

 

বিদেশি গবেষকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করছেন যে, বর্তমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি গবেষকদের সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতামূলক চুক্তিতে জড়ালে তা তাদের নিজস্ব পেশাগত সুনামের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক, গণমাধ্যমগত কিংবা নৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ সচেতনভাবেই ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এড়িয়ে চলছেন এবং চুক্তি বাতিল করছেন। পরিসংখ্যানের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে এই নীরব সংকটের ভয়াবহতা আরও পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করা যায়।

 

ইসরায়েলি গবেষকদের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান বা বাধাগ্রস্ত করার নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা গত কয়েক মাসে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ক্যালকালিস্ট-এর দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যেখানে এ ধরনের প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ছিল মাত্র ২০টি, সেখানে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মে মাসে তা আড়াই গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০টিতে।

 

ইসরায়েলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাংক ‘স্যামুয়েল নেমান ইনস্টিটিউট’-এর ২০২৬ সালের একটি বিস্তারিত গবেষণাপত্রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠা ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনের প্রবল চাপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

সংস্থাটি তাদের ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছে যে, বর্তমান এই বিদ্বেষপূর্ণ পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকলে আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েলের সামগ্রিক বিজ্ঞান গবেষণায় এর অত্যন্ত মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

 

আন্তর্জাতিক গবেষকদের এই সহযোগিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি, দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইসরায়েলে মেধা পাচারের হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

যে দেশটি একসময় আকর্ষণীয় প্রণোদনা দিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মেধা আকর্ষণ করত, আজ সেই দেশটিই তাদের নিজেদের মেধাবীদের ধরে রাখতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতের অত্যন্ত দক্ষ কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন ইসরায়েল ছেড়ে উন্নত বিশ্বের অন্য কোনো নিরাপদ দেশে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমানোর প্রবণতা দেখাচ্ছেন।

 

ক্রমাগত যুদ্ধাবস্থা, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিশ্বমঞ্চে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ার ভীতি থেকেই এই বিপুল সংখ্যক মেধাবী মানুষ দেশান্তরী হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ ও নীতি-নির্ধারকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, মেধা পাচার ও আন্তর্জাতিক অসহযোগিতার এই নীরব স্রোতের ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দেশের প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান হবে না।

 

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবসম্পদের উৎকর্ষ, নতুন উদ্ভাবনের পেটেন্ট নিবন্ধন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিকাশ এবং সামগ্রিকভাবে দক্ষ জনশক্তির ওপর এক অপরিবর্তনীয় ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে।

 

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যৌথ গবেষণার সুযোগ একেবারে সংকুচিত হয়ে গেলে এবং দেশের ভেতরের প্রতিভাবান তরুণরা দেশত্যাগ করলে ইসরায়েলের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির শক্তিশালী মেরুদণ্ড নিশ্চিতভাবেই ভেঙে পড়তে পারে।

 

ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং সামরিক আগ্রাসনের কারণে একটি দেশের অমিত সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনী খাত কীভাবে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে, বর্তমান ইসরায়েলের পরিস্থিতি তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, অতিসত্বর এই সংঘাতপূর্ণ নীতির পরিবর্তন না করলে অদূর ভবিষ্যতে ইসরায়েল থেকে আরও বেশি সংখ্যক মেধাবী মানুষের অভিবাসনের ঢল নামবে, যা তাদের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারকে চিরতরে ম্লান করে দিতে বাধ্য।

 

- পার্সটুডে