পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই কঠোর ও সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) উপ-প্রধান মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমের সামনে দেওয়া এক বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলামি বিপ্লবের আদর্শে বলীয়ান সাহসী ও প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা এই কৌশলগত জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো মূল্যে এই আধিপত্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বজায় থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির যে অসীম ভূকৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে, সেটিকে সামনে রেখেই তেহরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব এই আত্মবিশ্বাসী ও কড়া ঘোষণা দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তার ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বহুলাংশে নির্ভরশীল।
এমন একটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতির কথা তুলে ধরে মেজর জেনারেল ইজাদি জানিয়েছেন যে, দেশের প্রতিরক্ষায় কেবল বিপ্লবী গার্ড বাহিনীই নয়, বরং ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি শাখা অত্যন্ত সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহিরাগত যেকোনো ধরনের উসকানি বা আগ্রাসন প্রতিহত করতে তাদের ওপর অর্পিত জাতীয় ও কৌশলগত দায়িত্ব তারা চরম পেশাদারিত্ব ও সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন।
ইরানের সামরিক বাহিনীর এই নিশ্ছিদ্র ও সর্বাত্মক প্রস্তুতি যেকোনো সম্ভাব্য আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংঘাতের মুখে তাদের সামরিক শক্তিমত্তারই অকাট্য প্রমাণ বহন করে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং পারস্য উপসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোর সামরিক সুরক্ষার বিষয়টিও এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বিস্তারিতভাবে জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা এবং কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোতে ইসলামি বিপ্লবের নৌ ও স্থল যোদ্ধারা সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র ও পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে অবস্থান করছেন।
এই সমুদ্রবেষ্টিত অঞ্চলগুলোতে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ, গুপ্তচরবৃত্তি বা আকস্মিক সামরিক হামলা শক্ত হাতে রুখে দিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। ভৌগোলিকভাবে এই দ্বীপগুলো পারস্য উপসাগরে বহিরাগত শত্রুদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রথম সারির এক অভেদ্য প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।
তাই সেখানে সামরিক বাহিনীর এই ধরনের নিবিড় ও দৃশ্যমান উপস্থিতি মূলত প্রতিপক্ষকে একটি প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বার্তা দেওয়ারই সুপরিকল্পিত অংশ। তেহরান যে তাদের নিজস্ব জলসীমা ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়, সেটিই এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ ও তাদের মিত্রদের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামুদ্রিক অবরোধ আরোপের যে প্রচ্ছন্ন হুমকি মাঝেমধ্যেই দেওয়া হয়ে থাকে, তার পাল্টা ও কার্যকর জবাব দেওয়ার বিষয়েও তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন আইআরজিসির এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের কথিত সামুদ্রিক অবরোধ বা অর্থনৈতিক শ্বাসরোধকারী পদক্ষেপ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য ইরান ইতোমধ্যে বহুমুখী, আধুনিক ও নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল গ্রহণ করেছে।
শুধু কাগুজে পরিকল্পনাই নয়, বরং এই পাল্টা প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এরই মধ্যে সফলভাবে মাঠে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান মূলত গোটা বিশ্বকে প্রমাণ করে দেখাতে চাইছে যে, সমুদ্রে তাদের কোণঠাসা করার যেকোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত চরমভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং সমুদ্রবক্ষে তেহরানের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিত।
সবশেষে, শত্রুর নৌবহর এবং যুদ্ধজাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতার একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও নিখুঁত কারিগরি দিকের কথা উল্লেখ করেন মেজর জেনারেল ইজাদি। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা এখন বিশ্বস্বীকৃত এক বাস্তবতা।
যেকোনো যুদ্ধাবস্থায় বা প্রয়োজনে শত্রুপক্ষের অত্যাধুনিক রাডার সজ্জিত যুদ্ধজাহাজসহ যেকোনো ধরনের সামরিক নৌযানে নিখুঁতভাবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পূর্ণ ও প্রমাণিত সক্ষমতা এই বাহিনীর রয়েছে। সামুদ্রিক অবরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটিই তাদের অন্যতম প্রধান ও ধ্বংসাত্মক হাতিয়ার।
তিনি আরও দাবি করেন যে, অতীতের বিভিন্ন সামরিক মহড়া ও বাস্তব পদক্ষেপে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার যে অভাবনীয় সক্ষমতা ইরান প্রদর্শন করেছে, আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষ বা শত্রুরাও তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
সার্বিকভাবে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা এবং যেকোনো আগ্রাসনের মুখে চরম আঘাত হানার এই প্রকাশ্য ঘোষণা আঞ্চলিক প্রতিপক্ষগুলোর জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সামরিক বার্তা।