বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের স্বার্থে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

ইসরায়েলের স্বার্থে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা এবং ইসরায়েলের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।

 

তার মতে, দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা ধরনের সামরিক আগ্রাসনের হুমকি এবং নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো দমনমূলক পদক্ষেপ প্রয়োগ করেও ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

 

এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এখন কেবল নতুন করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথই বেছে নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক তীক্ষ্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী বার্তায় আরাগচি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর ধরে অবিরাম নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার্থে ইরানের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ উদ্ভাবনী সমাধান হলো আরও কিছু ভিত্তিহীন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া।

 

তিনি ওয়াশিংটনের এই একঘেয়ে ও আগ্রাসী নীতিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বশান্তির জন্য এক চরম বিপর্যয়কর দৃষ্টান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আরাগচির মতে, এমন হঠকারী ও একপেশে সিদ্ধান্তের ফলেই বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবশিষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে।

 

পাশাপাশি, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক কৌশল প্রয়োগেও মার্কিন নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এর সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরান উপকূলের প্রবল প্রতিরক্ষামূলক চাপের মুখে বাধ্য হয়েই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তাদের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ এবং বিমানবাহী বিশাল রণতরিগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূল থেকে প্রায় পাঁচশো মাইলেরও বেশি দূরে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

 

একই সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ আহ্বান জানানো হয়েছে, যা এই অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণকে আরও জটিল ও বহুমুখী করে তুলেছে।

 

কূটনৈতিক এই বাগযুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই নতুন করে রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি সরাসরি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে।

 

ইরানের আধা-সরকারি ও প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা তাসনিমের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী কর্তৃক পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে আকস্মিক হামলা চালানোর পর এর সরাসরি ও তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ হিসেবে আইআরজিসির নৌবাহিনী এই কঠোর সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

 

এই সামরিক উত্তেজনার এক পর্যায়ে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

 

এই যুদ্ধজাহাজ দুটি হলো ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক এবং ইউএসএস জন পল জোন্স। এর পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলরত অন্তত আটটি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপরও হামলা চালানোর কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে।

 

আইআরজিসি এক আনুষ্ঠানিক ও কঠোর সামরিক বিবৃতির মাধ্যমে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীর অযাচিত আগ্রাসন এবং প্রকাশ্য শত্রুতার এক দাঁতভাঙা জবাব হিসেবেই এই প্রতিশোধমূলক হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।

 

তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাতের সমপরিমাণ জবাব দিতে তেহরান সর্বদা প্রস্তুত। সামরিক এই সংঘাত কেবল যুদ্ধজাহাজ ও নির্দিষ্ট আটটি ট্যাংকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

 

আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির একটি সংরক্ষিত, সামুদ্রিক আইনের অধীনে নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত অনিরাপদ এলাকায় বেআইনিভাবে প্রবেশের চেষ্টা করা আরও অন্তত দশটি নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজকে তারা সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

 

ইরানের অভিযোগ, এই জাহাজগুলো সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ উসকানি ও প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ওই স্পর্শকাতর সামরিক জলসীমায় প্রবেশের দুঃসাহস দেখিয়েছিল। এই ঘটনার পর আইআরজিসি বিশ্ব সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহন সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে একটি কড়া বার্তা প্রদান করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণরূপে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিরঙ্কুশ নজরদারি এবং নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থাপনার অধীনে রয়েছে।

 

গত এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং পাল্টা হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে পরাশক্তিগুলোর এই সরাসরি সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন যে, এই পরিস্থিতি দ্রুত কূটনৈতিক উপায়ে প্রশমিত না হলে তা খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে এক সর্বনাশা ও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে।

 

ইরনা