বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধে ইরানে তীব্র ওষুধ সংকট, বিপন্ন লাখো রোগীর জীবন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধে ইরানে তীব্র ওষুধ সংকট, বিপন্ন লাখো রোগীর জীবন
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক চাপ, কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সংবেদনশীল সমুদ্রসীমায় কার্যকর নৌ অবরোধের কারণে চরম মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে ইরানের চিকিৎসা খাত।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এসব বহুমুখী বৈরী পদক্ষেপের সরাসরি প্রভাবে দেশটিতে জরুরি ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

 

বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও মৃগীরোগের মতো জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধিতে আক্রান্ত সাধারণ রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধ না পেয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও চিকিৎসা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জাঁতাকলে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির নিরীহ সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার মারাত্মকভাবে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।

 

ইরানি ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আনুষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৮০০ ধরনের চিকিৎসা সামগ্রী ও অপরিহার্য ওষুধের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকটময় তালিকার মধ্যে এমন ৯০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ রয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর প্রাণ রক্ষায় অপরিহার্য বলে বিবেচিত।

 

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘাটতির তালিকায় থাকা ওষুধগুলোর মধ্যে অন্তত ৪০০টি ওষুধ এর আগে ইরানের নিজস্ব গবেষণাগার ও আধুনিক কারখানাতেই পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হতো। তবে কাঁচামালের তীব্র সংকট ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান আমদানিতে আন্তর্জাতিক অচলাবস্থার কারণে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

ওষুধের এই সামগ্রিক দুষ্প্রাপ্যতার পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে জীবন রক্ষাকারী প্রতিটি ওষুধের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজের প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃগীরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্যাবাপেন্টিনের দাম গত এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

 

এর বাইরেও অতি সাধারণ জ্বর ও ব্যথানাশক প্যারাসিটামলের দাম ৩৭৫ শতাংশ, বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক অ্যামোক্সিসিলিন ২৮৫ শতাংশ এবং মানসিক অবসাদ দূর করার ওষুধ ফ্লুওক্সেটিনের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সবচাইতে চরম সংকটে পড়েছেন দেশটির লাখ লাখ ডায়াবেটিস রোগী, কারণ তাদের প্রতিদিনের জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন ইনসুলিনের বাজারমূল্য একলাফে প্রায় ছয় গুণ বেড়ে গেছে, যা সাধারণ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে।

 

চিকিৎসা খাতের এই সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি চলমান সামরিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ ধ্বংসযজ্ঞও সমানভাবে দায়ী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক সংঘাতের প্রভাবে ইরানে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৪টি ওষুধ প্রস্তুতকারী এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির কারখানা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

 

এসব কারখানায় চালানো হামলায় অন্তত ৫০ জন ওষুধ বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ শিল্পকর্মী হতাহত হয়েছেন। বিশেষ করে দেশটির জাতীয় পেনশন ফান্ডের আওতাধীন প্রধান ক্যানসার ওষুধ প্রস্তুতকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘তৌফিক দারু’ বিমান হামলায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইরানের চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে।

 

প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় পরিচালক মরিয়ম ফারাহানি এক বিবৃতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ওই হামলায় তাদের উন্নত গবেষণাগার এবং মূল উৎপাদন লাইনের পাশাপাশি বিগত ২৬ বছরের সংরক্ষিত সমস্ত অমূল্য বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ডেটা সার্ভার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

 

তিনি স্পষ্ট করেন, এই কারখানাটি পুনরায় আংশিকভাবে সচল করতে গেলেও কয়েক বছর সময় এবং কোটি কোটি ডলারের বিপুল বৈদেশিক অর্থের প্রয়োজন হবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র বাহিনী অভিযোগ করেছে যে প্রতিষ্ঠানটিতে রাসায়নিক অস্ত্রের গোপন গবেষণা চালানো হচ্ছিল, তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ সেই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট প্রোপাগান্ডা বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

এমন এক বহুমুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা আশা ছাড়ছেন না। সম্প্রতি তেহরানে আয়োজিত মেহর ফার্মাক্স আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রধান মেহেদি পীরসালেহি দাবি করেন যে, নানামুখী বৈরী পরিস্থিতি ও বিদেশি আগ্রাসন সত্ত্বেও দেশটির ওষুধ খাত পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এই সংকট উত্তরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

 

তবে দেশটির তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসকেরা এক চরম স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, আমদানি চ্যানেলগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের রোটাভাইরাস ও সাধারণ মানুষের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের মতো সুরক্ষামূলক টিকার সরবরাহ দেশে একেবারেই শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

 

একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ওষুধ খাতে সরকারের প্রায় ৮ কোয়াড্রিলিয়ন ইরানি রিয়াল বা ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল অঙ্কের বকেয়া ঋণ জমে থাকায় পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অর্থনৈতিক কাঠামো এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন না হলে ইরানে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি নেমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

 

- আল জাজিরা