বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জর্ডানে ইরানের ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, ১৮টি প্রতিহত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১৮ পিএম

জর্ডানে ইরানের ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, ১৮টি প্রতিহত
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। জর্ডানের আল আজরাক অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে গত মঙ্গলবার মোট ২০টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের সামরিক বাহিনী।

 

তবে জর্ডানের অত্যন্ত দক্ষ ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুবাদে একটি বড় ধরনের সামরিক ও মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই আটকে দিয়ে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাতে এক নতুন, অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বুধবার জর্ডানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতিতে এই নজিরবিহীন হামলার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, গত মঙ্গলবার সরাসরি জর্ডানের সার্বভৌম ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান থেকে এই ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। দেশের আকাশসীমার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে জর্ডানের সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

 

তাদের নিখুঁত রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই আকাশেই সফলভাবে প্রতিহত করা হয়। যে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে জর্ডানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল, সেগুলো সম্পূর্ণ জনমানবহীন ও পরিত্যক্ত মরু অঞ্চলে পতিত হয়েছে।

 

ফলে এই অতর্কিত ও ভয়াবহ হামলায় জর্ডানের সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়নি বা কোনো ধরনের অর্থনৈতিক, কাঠামোগত কিংবা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেনি বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।

 

মূলত, গত কয়েক দিন ধরে পারস্য উপসাগর এবং তৎসংলগ্ন সামুদ্রিক অঞ্চলে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে প্রত্যক্ষ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে, জর্ডানের এই মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা তারই এক অনিবার্য ও সরাসরি পরিণতি।

 

আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি সংঘাতের সূত্রপাত হয় যখন ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে টহলরত মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি অত্যাধুনিক ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে অতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

 

ওই ভয়াবহ হামলায় মার্কিন সামরিক নৌযান দুটির ব্যাপক মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়, যা পেন্টাগনকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। নিজেদের যুদ্ধজাহাজে এমন আগ্রাসী হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই নীরব থাকেনি ওয়াশিংটন।

 

এর তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত কড়া জবাব দিতে গত মঙ্গলবার ওমান উপসাগর এবং ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জীবনীশক্তি হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপের নিকটবর্তী অঞ্চলে একযোগে বিধ্বংসী আক্রমণ পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম।

 

অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও নিখুঁত এই সামরিক অভিযানে ইরানের ৫টি বৃহৎ তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজকে সরাসরি আঘাত করে সম্পূর্ণভাবে অকেজো করে দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। সেন্টকমের পরিচালিত ওই ধ্বংসাত্মক নৌ হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে তেহরান।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রত্যাঘাতের সরাসরি পাল্টা জবাব হিসেবেই কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে জর্ডানের আল আজরাক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এই ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আইআরজিসি। আল আজরাকের এই বিমানঘাঁটিটি ওই অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহিনীর কৌশলগত অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

তবে পরিস্থিতি এখানেই শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং এই সংঘাতের বিস্তৃতি পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার এক ভয়াবহ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বুধবার আইআরজিসির পক্ষ থেকে দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া, আগ্রাসী ও হুমকিপূর্ণ বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র রাষ্ট্র কুয়েত এবং বাহরাইনের সমুদ্রবন্দরগুলোতেও ব্যাপক সামরিক হামলা চালানোর সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা।

 

আইআরজিসির ওই বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চরম উদ্বেগজনক এক সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনের বিভিন্ন বন্দরে অবস্থানরত সকল তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজের ক্রুদের এবং সংশ্লিষ্ট সকল বন্দরকর্মীদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে দিচ্ছে।

 

জাহাজগুলো বন্দরে নোঙ্গর করা অবস্থায় থাকুক কিংবা সমুদ্র উপকূলে যেকোনো অবস্থাতেই থাকুক না কেন, সকল নাবিক ও ক্রুকে অবিলম্বে নিজেদের প্রাণ রক্ষার্থে জাহাজ ত্যাগ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ খুব শিগগিরই এই বাণিজ্যিক নৌযানগুলোকে আইআরজিসির সামরিক আক্রমণের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে।

 

সামরিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই অনবরত পাল্টাপাল্টি হামলা এবং প্রকাশ্য হুমকির ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর পড়তে বাধ্য।

 

- আল জাজিরা, এএফপি