তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তা হলো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, উচ্ছেদ অভিযান এবং নিষ্ঠুর দমন-পীড়নকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশটির রক্ষণশীল ও কট্টর ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করে ব্যালট বাক্সে নিজেদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি করতে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নির্যাতনকে এখন আর কোনোভাবেই আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে না, বরং সেটিকে এক ধরনের গর্বের অর্জন ও নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে।
চলমান এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী লড়াইয়ে কট্টর ডানপন্থি সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার উদ্দেশ্যে আধুনিক প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন স্বয়ং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
তিনি বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি নানাবিধ উসকানিমূলক ভিডিওর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছেন। নেতানিয়াহুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত অন্যতম একটি বিতর্কিত বার্তায় দেখা গেছে, তিনি জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গাদি আইজেনকোটকে তীব্র আক্রমণ করেছেন।
সাধারণ ভোটারদের সতর্ক করে নেতানিয়াহু প্রচার করছেন যে, আইজেনকোট আসলে ইসরায়েলি বামপন্থি শক্তি এবং ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ মানসুর আব্বাসের রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য ভেতরে কাজ করা একটি ‘ট্রোজান হর্স’ বা ছদ্মবেশী ধ্বংসকারী।
ডানপন্থি ইহুদি ভোটারদের মধ্যে ভয় ও জাতীয়তাবাদী আবেগ ছড়িয়ে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করতেই নেতানিয়াহু এ ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর কট্টর জোটের অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার ও দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের সামগ্রিক নির্বাচনী প্রচারণার প্রায় পুরোটাই আবর্তিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত ইহুদি বসতি সম্প্রসারণকে ঘিরে।
উগ্র জাতীয়তাবাদী এই নেতা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের আদি ভূমি জবরদখল করে একের পর এক নতুন বসতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে কথিত ‘বিপ্লবী পরিবর্তন’ ঘটিয়েছেন, তা তিনি ফলাও করে নিজের বিভিন্ন প্রচারণামূলক ভিডিওতে তুলে ধরছেন।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নির্বিঘ্ন আবাসন ও অবকাঠামো তৈরি করাকে তিনি নিজের মন্ত্রণালয়ের অনন্য সাফল্য হিসেবে ভোটারদের সামনে জাহির করছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কড়া নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দাকে পুরোপুরি তোয়াক্কা না করে পশ্চিম তীরকে স্থায়ীভাবে গ্রাস করার এই উগ্র এজেন্ডাই মূলত স্মোত্রিচের নির্বাচনি তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সমীকরণে দেশটির অতি-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ভূমিকা নির্বাচনী ময়দানে চরমপন্থার এক ভয়াবহ নজির স্থাপন করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয় এই রাজনীতিবিদ নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনিদের শত শত বসতবাড়ি ভেঙে দেওয়ার দৃশ্য এবং আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে ইসরায়েলি নিরাপত্তাবাহিনীর চরম অবমাননাকর ও অমানবিক আচরণের ভিডিও ক্লিপ প্রচার করে যাচ্ছেন।
চরম বিতর্কের জন্ম দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এমন একটি লোমহর্ষক ভিডিও তিনি জনসমক্ষে প্রচার করেছিলেন, যেখানে ইসরায়েলি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফিলিস্তিনি বন্দিদের নির্মম মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
যদিও তীব্র সমালোচনার মুখে পরবর্তীতে বেন-গভিরের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে এই ভিডিওগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়, ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সেগুলো লাখ লাখ বার দেখা এবং ডাউনলোড হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষক ও মধ্যপ্রাচ্যের পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ আজ এমন এক বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে যেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর দৈনন্দিন নির্যাতন কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকা এবং ভোটের হিসেব মেলানোর ক্ষেত্রে এটি এখন সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারে রূপ নিয়েছে।
অধিকৃত অঞ্চলের নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন যত তীব্র হবে, কট্টরপন্থি সমর্থন তত বাড়বে-এমন এক অসুস্থ ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির শিকার হচ্ছে সমগ্র ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড।
রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও জীবনের নিরাপত্তাকে পদদলিত করার এই নজিরবিহীন প্রবণতা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক স্থিতিশীলতার পথকে আরও রুদ্ধ করে তুলছে।