গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক নৌযানের ওপর এটি তাদের তৃতীয় হামলার ঘটনা। এই ধারাবাহিক হামলার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় উপনীত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতের এই আকস্মিক হামলা ওই অঞ্চলের ভঙ্গুর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আবারও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক নৌযানের ওপর এই সফল অভিযান পরিচালনা করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, আক্রান্ত নৌযান দুটি মূলত মার্কিন সামরিক বাহিনীর অত্যাধুনিক সামুদ্রিক ড্রোন বা চালকবিহীন জলযান ছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম অপারেশন সেন্টার এই হামলার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে একটি পৃথক বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটির দেওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় ঠিক সন্ধ্যা সাতটা বেজে দশ মিনিটে, যা বাংলাদেশ সময় রাত একটা বেজে দশ মিনিট, হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত ওই দুটি মার্কিন নৌযানে অন্তত চারটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র অথবা ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে।
এই ভয়াবহ ও সুনির্দিষ্ট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানে তাৎক্ষণিকভাবে ভয়াবহ আগুন ধরে যায় এবং জলযানটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবে অপর নৌযানটির বর্তমান অবস্থা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে এসে পৌঁছায়নি।
ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম অপারেশন সেন্টারের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ঠিক যে নির্দিষ্ট এলাকায় এই রোমহর্ষক হামলার ঘটনাটি ঘটেছে, ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় সেখান থেকে ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের রাজধানী আল খাসাবের উপকূলীয় অঞ্চলের দূরত্ব মাত্র সাত দশমিক চার কিলোমিটার।
এই নিকটবর্তী অবস্থান প্রমাণ করে যে, হামলাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিল, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই জলপথে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এক ধারাবাহিক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
এর আগে গত ছয় ও সাত সেপ্টেম্বর তারিখে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ার বা বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল আইআরজিসি। ওই নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে যুদ্ধজাহাজ দুটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছিল।
সেই রেশ কাটতে না কাটতেই গত নয় সেপ্টেম্বর তারিখে পুনরায় আরও দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই অভিজাত শাখা। সেই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাতের এই ঘটনাটি হলো গত সাত দিনের মধ্যে তৃতীয় দফার বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ, যা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে ইরান এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়।
ঐতিহাসিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী একশত সাতষট্টি কিলোমিটার দীর্ঘ এই হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম বাণিজ্যিক জলপথগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ এই জলপথের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল, কারণ সমগ্র পৃথিবীর উৎপাদিত মোট জ্বালানি পণ্যের এক-পঞ্চমাংশ নিয়মিতভাবে এই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়ে থাকে।
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব ভূখণ্ড ও পানিসীমার অন্তর্গত। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সাম্প্রতিক সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত এই প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে উল্লেখ করার মতো কোনো ধরনের বাধা বা সামরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না।
গত আটাশ ফেব্রুয়ারি তারিখে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বাত্মক সামরিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পুরো দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান সরকার কঠোর সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এর পাল্টা ও সমান্তরাল জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সমস্ত সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ জারি করে। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ এবং ক্রমাগত সামরিক উত্তেজনার ফলস্বরূপ বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে এক ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে এসেছে, যার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই প্রকটভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।