ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন, যাতে তারা কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিজেদের দেশে ফিরে যায়। অন্যথায় তাদের চরম পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে বলে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সংসদীয় কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সংসদীয় কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি তার অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট করেছেন।
সেখানে তিনি পারস্য উপসাগরের ওপর ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ঐতিহাসিক অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তার এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা লেগেই আছে এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
ইব্রাহিম আজিজি তার বিবৃতিতে সরাসরি মার্কিন বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে কথা বলেছেন এবং তাদেরকে ওই অঞ্চল ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। নিজের দেওয়া ওই বার্তায় ইব্রাহিম আজিজি লিখেছেন, “ইরানের নৌবাহিনীর সাহসী যোদ্ধারা এটা আবার প্রমাণ করেছে যে, পারস্য উপসাগর সব সময় পারস্য উপসাগর হিসেবেই থাকবে এবং এটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিজয়ী ইরান।”
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তায় বিদেশি কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ যে তেহরান কখনোই মেনে নেবে না, সেই পুরনো এবং দৃঢ় নীতিরই পুনরুক্তি করা হয়েছে। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল এই অঞ্চলের দেশগুলোরই।
বাইরের কোনো শক্তির উপস্থিতি এখানে কেবল অস্থিতিশীলতাই তৈরি করে। ঐতিহাসিকভাবেই পারস্য উপসাগরের নামকরণ এবং এর ওপর অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কিছু আরব দেশ এবং পশ্চিমা শক্তি মাঝেমধ্যেই এই অঞ্চলটিকে ভিন্ন নামে ডাকার চেষ্টা করেছে, যা তেহরানের কাছে তীব্র আপত্তিকর একটি বিষয়।
ইব্রাহিম আজিজি তার বিবৃতিতে ‘পারস্য উপসাগর সব সময় পারস্য উপসাগর হিসেবেই থাকবে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা মূলত সেই ঐতিহাসিক অধিকার এবং জাতীয় গর্বেরই প্রতিফলন। ইরানের নেতৃত্ব বারবার স্পষ্ট করেছে যে, তাদের জলসীমা এবং ঐতিহাসিক পরিচয়ের ওপর কোনো ধরনের আঘাত তারা বরদাশত করবে না।
এর পাশাপাশি ‘বিজয়ী ইরান’ কথাটির মাধ্যমে তিনি দেশের সামরিক বাহিনী এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার বিষয়টিও পশ্চিমা বিশ্বের সামনে অত্যন্ত সুকৌশলে তুলে ধরেছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে আরও কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে ইব্রাহিম আজিজি বলেন, “দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আপনাদের অবশিষ্ট সরঞ্জাম ও সদস্যদের রক্ষা করতে পালিয়ে নিজ দেশের মাটিতে ফিরে যান।
হয়তো তখন অন্তত নিজেদের সীমান্ত রক্ষা করতে পারবেন।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি তাদের অভ্যন্তরীণ সীমান্ত সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়েও একপ্রকার কটাক্ষ করেছেন।
এটি স্পষ্টতই একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপের অংশ, যা ইরান নিয়মিতভাবে তার প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে ব্যবহার করে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সুরক্ষা এবং অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যুক্তি দেখিয়ে এই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ ও সেনা মোতায়েন করে রেখেছে।
অন্যদিকে, ইরান এই উপস্থিতিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ইরানের সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে নৌবাহিনী প্রায়শই পারস্য উপসাগরে টহল দেয় এবং মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর কাছাকাছি এসে নিজেদের উপস্থিতি ও সক্ষমতা জানান দেয়।
ইব্রাহিম আজিজির এই সাম্প্রতিক মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত ইরানের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তেহরান বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দিতে চায় যে, পারস্য উপসাগরের জলসীমায় যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা বা বিদেশি তেলবাহী জাহাজ আটকের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইরান কেবল ফাঁকা বুলি আওড়ায় না, বরং প্রয়োজনে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতেও তারা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সংসদীয় কমিশনের এই শীর্ষ কর্তার মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কড়া বার্তা।
তবে এই হুঁশিয়ারির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত পারস্য উপসাগরের নীল জলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার যে কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়েই দাঁড়িয়েছে।