সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় এই ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য সম্প্রচার সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের প্রকাশিত একটি বিশদ সামরিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
দুই পরাশক্তির এই প্রত্যক্ষ সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আবারও খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। সিবিএস নিউজের ওই সংবাদ প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকাশযানের ক্ষয়ক্ষতির একটি সুনির্দিষ্ট ও পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, জর্ডানের আল আজরাক অঞ্চলে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘মুয়াফ্ফাক সালতি বিমানঘাঁটি’ লক্ষ্য করে ইরান গত ৮ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার গভীর রাতে এই বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
সামরিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, হামলার তীব্রতা এবং নিখুঁত নিশানা এতটাই বেশি ছিল যে, মার্কিন বিমানবাহিনীর বহুল ব্যবহৃত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ‘এ-১০ থান্ডারবোল্ট’ নজরদারি ও আক্রমণাত্মক বিমানের একটি ডানা সম্পূর্ণভাবে উড়ে গেছে।
এর পাশাপাশি, ওই ঘাঁটিতে অবস্থানরত আরও অন্তত আটটি ‘এফ-১৫’ যুদ্ধবিমানও এই আকস্মিক হামলায় যথেষ্ট মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অত্যাধুনিক সামরিক যুদ্ধবিমানের এমন অভাবনীয় ক্ষতি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবেই বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।
এই হামলার প্রেক্ষাপট হিসেবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পাল্টাপাল্টি আঘাতের সমীকরণ কাজ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সিবিএস নিউজের প্রভাবশালী প্রতিরক্ষা প্রতিবেদক জেনিফার জ্যাকবস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি বিশেষ বার্তায় ঘটনার পেছনের মূল কারণটি স্পষ্ট করেছেন।
তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ইরান আগে যে হামলা চালিয়েছিল, তার কড়া ও তাৎক্ষণিক জবাব দিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতেই মার্কিন বিমানবাহিনী একটি জোরালো অভিযান পরিচালনা করে।
ওই বিশেষ সামরিক অভিযানে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজ সম্পূর্ণভাবে অকেজো করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর এই ঘটনার ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে ইরানের শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি।
তারা বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সরাসরি জর্ডানের মাটিতে থাকা মার্কিন ওই বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি শুরু করে। তবে ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীও এই অতর্কিত হামলার সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা অপ্রস্তুত ছিল না।
ইরানের ছোঁড়া একের পর এক বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যখন রাতের অন্ধকারে জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে ঘাঁটির দিকে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসছিল, তখন সেগুলো শূন্যেই ধ্বংস করার জন্য মার্কিন সেনারা সর্বাত্মক ও মরিয়া চেষ্টা চালায়।
আল আজরাকের ওই বিমানঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিয়োজিত সেনারা নিজেদের সামরিক অবস্থান এবং রানওয়েতে থাকা যুদ্ধবিমানগুলো সুরক্ষিত রাখতে অন্তত ৩০টিরও বেশি অত্যাধুনিক ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিষেধক বা ইন্টারসেপ্টর হিসেবে নিক্ষেপ করে।
এই তীব্র আকাশযুদ্ধের কারণে ওই রাতে জর্ডানের আকাশে এক ভীতিকর ও রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে নির্ভরযোগ্য সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। এদিকে, নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এহেন নজিরবিহীন সামরিক সংঘাতের পর বুধবার সকালে জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বিবৃতি প্রদান করেছে।
তাদের দাবি অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতের ওই ভয়াবহ হামলায় ইরান সর্বমোট ২০টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। তবে জর্ডানের নিজস্ব উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অত্যন্ত সফলতার সাথে এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেছে যে, ইরানের ছোঁড়া ওই ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে অন্তত ১৮টিকে মাটিতে বা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই মাঝ আকাশে সফলভাবে আটকে দিয়ে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে তাদের রাডার ও প্রতিরক্ষা ইউনিট।
জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের ছোঁড়া যে দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শেষ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে নিচে নেমে এসেছিল, সেগুলোও কোনো জনবহুল বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানতে পারেনি।
বরং সেগুলো এমন একটি সম্পূর্ণ নির্জন ও ফাঁকা অঞ্চলে পতিত হয়েছে, যেখানে কোনো মানুষের বসবাস নেই এবং কোনো স্থাপনাও নেই। ফলশ্রুতিতে, এই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে জর্ডানের সাধারণ জনজীবনে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি এবং দেশটিতে কোনো অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও সাধিত হয়নি।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই সামগ্রিক সংঘাতের চিত্রটি উঠে এসেছে, যা আবারও প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সামরিক উত্তেজনার পারদ দিন দিন আরও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে।