বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইরানি শীর্ষ উপদেষ্টা

মার্কিন আগ্রাসনের কারণেই বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রাচ্যের দিকে ঝুঁকছে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

মার্কিন আগ্রাসনের কারণেই বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রাচ্যের দিকে ঝুঁকছে
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে চলমান পালাবদল এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পরিবর্তনের নেপথ্যে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রধান কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশটির ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল সাইয়্যেদ ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী ও জবরদস্তিমূলক আচরণের কারণেই বিশ্বমঞ্চে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক ভূগোল এখন স্পষ্টভাবে প্রাচ্যের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় তিনি এই গভীর ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পার্সটুডে এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে।

 

বিশ্বব্যবস্থায় গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রের একমেরুকেন্দ্রিক আধিপত্যের অবসান এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক নতুন বিশ্বকাঠামো গড়ে ওঠার যে জোরালো আলোচনা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরাজমান, মেজর জেনারেল সাফাভির এই বক্তব্য মূলত তারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।

 

তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে সামরিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন দেশগুলোর ওপর যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে, তার নেতিবাচক ফল হিসেবেই আজ প্রাচ্যের দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে।

 

বিগত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং শাসন পরিবর্তনের যে বেপরোয়া নীতি অনুসৃত হয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে কেবল অস্থিতিশীলতাই সৃষ্টি করেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই জবরদস্তিমূলক নীতিই মূলত এশিয়া ও ইউরেশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে বিকল্প অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক শক্তিশালী জোট গঠনে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছে। ফলশ্রুতিতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি ধীরে ধীরে পশ্চিমা বলয় থেকে বেরিয়ে প্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ধাবিত হচ্ছে।

 

এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের একটি বড় ও দৃশ্যমান প্রমাণ হলো সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) বা ব্রিকসের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জোটগুলোর অভাবনীয় উত্থান। এই জোটগুলোর মাধ্যমে এশিয়ার উদীয়মান পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নিজেদের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রসার ঘটাচ্ছে।

 

এর মাধ্যমে তারা পশ্চিমাদের আরোপিত একতরফা ও অমানবিক নিষেধাজ্ঞার জাল ছিন্ন করে নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভূগোল গড়ে তুলছে। শক্তির এই রূপান্তরের কারণে বিশ্ববাণিজ্যের নতুন নতুন করিডোর এবং জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল পশ্চিমাদের হাতে কুক্ষিগত নেই।

 

জেনারেল সাফাভি তার ওই বার্তায় আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, পরাশক্তিগুলোর অহেতুক জয়ের ভান করা মূলত তাদের চূড়ান্ত ব্যর্থতারই একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ।

 

একইসঙ্গে এটি বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার বহুমেরুকরণ এবং নতুন কাঠামোর অধীনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে নিরুপায় হয়ে মেনে নেওয়ারই একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি। বিশ্লেষকদের মতে, সাফাভির এই মন্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে এক নতুন ধরনের প্রচ্ছন্ন স্নায়ুযুদ্ধ একেবারে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও আধিপত্য বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক তেমনিভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সেই অযাচিত প্রভাবকে এখন সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।

 

পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যে আগের মতো আর চাইলেই যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাতে নিজেদের ইচ্ছা ও শর্ত একতরফাভাবে চাপিয়ে দিতে পারছে না, সেটিও এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি প্রমাণিত ও নগ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে।

 

জয়ের ভান করার যে কথাটি সাফাভি সুকৌশলে উল্লেখ করেছেন, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষয়িষ্ণু বৈশ্বিক প্রভাব এবং বাধ্য হয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার প্রতিই সরাসরি ইঙ্গিত করে।

 

ইরানের নীতিনির্ধারণী মহলে এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তে মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া রহিম সাফাভির এই মন্তব্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব বহন করে থাকে। তিনি ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একজন সাবেক শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ নেতার প্রধান সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।

 

ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার এই বক্তব্যকে নিছক কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামতের বদলে বরং তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির আনুষ্ঠানিক বয়ান হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

 

এই বার্তার মাধ্যমে ইরান মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটিই স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের দিন খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ণীত হতে যাচ্ছে প্রাচ্যের মাটিতেই।

 

এই নতুন বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক ঐক্যই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মূল ভিত হিসেবে কাজ করবে বলে তেহরান অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্বাস করে।

 

- পার্সটুডে