বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আরব লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

আরব লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই আরব লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ১৬৬তম অধিবেশনে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি ও অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে আরব লীগের ওই চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আরব দেশগুলোর এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক বিবৃতি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা পালন তো করবেই না, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভেদ ও গভীর ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করবে।

 

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে ইরান মনে করে, এই ধরনের মনগড়া অভিযোগ পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি নষ্ট করে দেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ও স্বনামধন্য সংবাদ সংস্থা পার্সটুডে থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিশদ ও সময়োপযোগী বিবৃতিতে চলমান আঞ্চলিক সংকটের প্রকৃত কারণগুলোর প্রতি আরব দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

 

বিবৃতিতে অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে পশ্চিম এশিয়া তথা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং অস্থিতিশীলতার প্রধান ও একমাত্র উৎস হলো ইসরায়েল।

 

অধিকৃত ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া এবং অন্যান্য আরব ও মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী অব্যাহতভাবে যে নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন, নির্বিচার গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা আজ সমগ্র বিশ্বের সামনে সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত।

 

এমন এক সংকটময় ও রক্তক্ষয়ী মুহূর্তে ফিলিস্তিনের মজলুম ও অধিকারবঞ্চিত জনগণকে নিঃশর্ত সমর্থন প্রদান করা এবং ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব ও বেপরোয়া সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসন মোকাবিলার দিকে সর্বাধিক মনোযোগ দেওয়া আরব লীগের প্রধান নৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য ছিল।

 

কিন্তু তা না করে, গুটিকয়েক আরব সদস্য দেশের প্ররোচনায় পড়ে ইরানের বিরুদ্ধে বারবার ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করার বিষয়টি কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি মূল সংকট থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত অপকৌশল মাত্র।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি ইরানের দীর্ঘদিনের সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতির বিষয়টি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তেহরান জোর দিয়ে বলেছে যে, ইরান সর্বদা তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

 

বর্তমান জটিল বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য ও সংহতি জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। তাই বিভেদ সৃষ্টিকারী যেকোনো ভিত্তিহীন অবস্থান গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার জন্য আরব লীগের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

 

তেহরান বিশ্বাস করে, পারস্পরিক বিরোধ কেবল এই অঞ্চলের বাইরের স্বার্থান্বেষী মহলকেই লাভবান করবে। আরব লীগের ঘোষণাপত্রে পারস্য উপসাগরীয় তিনটি কৌশলগত দ্বীপের মালিকানা নিয়ে যে অযাচিত দাবি তোলা হয়েছে, তার জবাবে তেহরান অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পুনরায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, বু আলী (আবু মুসা), তুনবে বুজুর্গ (বৃহত্তর তুনব) এবং তুনবে কুচেক (ক্ষুদ্রতর তুনব) দ্বীপপুঞ্জের ওপর ইরানের অবিসংবাদিত ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব রয়েছে। এই তিনটি দ্বীপ ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের পবিত্র ভূখণ্ডের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

 

এই দ্বীপগুলোর মালিকানার বিষয়ে যেকোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবির তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরান স্পষ্টভাবে বলেছে, এই দ্বীপগুলোর ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত ও সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিভিন্ন সম্মেলনে বা বিবৃতিতে এই ধরনের ভিত্তিহীন দাবির পুনরাবৃত্তি ঘটানো হলেও, তা কোনোভাবেই এই দ্বীপগুলো সম্পর্কিত শাশ্বত ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক এবং আইনি বাস্তবতাকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারবে না।

 

এছাড়া, আরব লীগের ঘোষণাপত্রে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইরানের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত যে বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়েছে, তা-ও সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা স্বাধীনতায় ইরান কখনোই হস্তক্ষেপ করেনি এবং করার কোনো ইচ্ছাও পোষণ করে না। বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান শুরু থেকেই ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সরাসরি এবং অর্থবহ ‘ইয়েমেন-ইয়েমেন’ সংলাপকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করে এসেছে।

 

একই সঙ্গে ইয়েমেনের জাতীয় ঐক্য, সংহতি এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরও ইরান সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে বিশ্বমঞ্চে কথা বলেছে। বিবৃতিটির উপসংহারে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংবেদনশীল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে ইরান।

 

তেহরান অত্যন্ত জোরালোভাবে এই চিরন্তন নীতির ওপর জোর দিয়েছে যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগর অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা অবশ্যই এই অঞ্চলের উপকূলীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা এবং যৌথ সহযোগিতার ভিত্তিতেই নিশ্চিত করতে হবে।

 

এই অঞ্চলে শান্তি ও অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার নামে বাইরের কোনো বিদেশি পরাশক্তির হস্তক্ষেপ বা সামরিক উপস্থিতি ইরান কখনোই মেনে নেবে না। এ ধরনের বাইরের শক্তির উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য রক্ষাকবচ নয়, বরং চরম হুমকিস্বরূপ বলেই তেহরান দৃঢ়ভাবে মনে করে।

 

- পার্সটুডে