শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালির সংকট নিরসনে আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম

হরমুজ প্রণালির সংকট নিরসনে আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকে ইরান
ছবি: File Photo

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির চলমান তীব্র সংকট নিরসনে একটি যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে ইরান।

 

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী ছয়টি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে দেশটি।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান এবং বাহরাইনের শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর ওমানের রাজধানী মাসকাটে এই ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাপের কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করছেন।

 

ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই আসন্ন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিশ্চিত করেছেন। শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আইআরআইবিকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জানান, হরমুজ প্রণালিতে ওমান এবং ইরানের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ নতুন, নিরাপদ এবং নির্বিঘ্ন যৌথ নৌপথ চালুর ব্যাপারে আগামী সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মাসকাটে একটি চূড়ান্ত কূটনৈতিক বৈঠক এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে।

 

এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সশরীরে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট তাঁর ওই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় উল্লেখ করে বলেন যে, ইরানের সঙ্গে চলমান সশস্ত্র সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব রাষ্ট্রের ভূখণ্ড বা সামরিক স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ব্যবহার করছে, সেসব রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সরকারি প্রতিনিধিরাও এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।

 

এছাড়া, বৈশ্বিক সামুদ্রিক আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নৌপথ সংস্থা বা আইএমও-কেও এই নতুন নৌপথ ও চুক্তির ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

 

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সরাসরি সংযুক্তকারী প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই হরমুজ প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর এবং ব্যস্ত একটি কৌশলগত সামুদ্রিক জলপথ। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই প্রণালির গুরুত্ব আক্ষরিক অর্থেই অপরিসীম।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই অতি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন পরিবাহিত হয়, যার ওপর এশিয়া, ইউরোপসহ গোটা বিশ্বের শিল্প ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

 

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালির একপাশে রয়েছে ইরান এবং অপর প্রান্তে অবস্থান করছে ওমান। ভূ-রাজনৈতিকভাবে এই প্রণালির একটি বিশাল অংশ ইরানের নিজস্ব সার্বভৌম জলসীমার অন্তর্ভুক্ত।

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক প্রণালিতে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে দৃশ্যত কোনো ধরনের বড় বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছিল না।

 

তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই স্বাভাবিক ও অত্যন্ত ব্যস্ত গতিপথটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে শুরু করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। এদিন দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ বা প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বসে ইরান।

 

এর তাৎক্ষণিক পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পশ্চিমা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সামুদ্রিক বন্দরগুলোর ওপর সর্বাত্মক নৌ ও অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে। বিবদমান এই দুই শক্তির পাল্টাপাল্টি সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের অনিবার্য ফলশ্রুতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

 

এর ফলে গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং সাপ্লাই চেইনে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক জোটের নাম গালফ সিকিউরিটি কাউন্সিল বা জিসিসি।

 

আসন্ন বহুল প্রতীক্ষিত এই বৈঠকের স্বাগতিক দেশ ওমান এই প্রভাবশালী জিসিসি জোটের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভারসাম্য রক্ষাকারী সদস্য রাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তরফ থেকে আকস্মিক অবরোধ জারি এবং চলমান সংঘাতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে অবস্থিত পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যক্ষ হামলা পরিচালনার কারণে গত কয়েক মাস ধরে জিসিসি জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল।

 

এই তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধাবস্থা, আতঙ্ক ও চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। এই জটিল ও সংঘাতময় প্রেক্ষাপটে ওমানের রাজধানী মাসকাটে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে নিঃসন্দেহে একটি বিশাল মাইলফলক।

 

বস্তুতপক্ষে, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো ইরান তার মধ্যপ্রাচ্যীয় আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোনো প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।

 

ওমান ঐতিহ্যগতভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে এবং এই বৈঠকের আয়োজনেও তাদের সেই গঠনমূলক ও শান্তিপ্রিয় ভূমিকার প্রতিফলন ঘটেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আসন্ন বৈঠকের সফলতা কেবল হরমুজ প্রণালির রুদ্ধ হয়ে থাকা বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের পথকেই সুগম করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা প্রশমন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধানের পথও উন্মুক্ত করতে পারে, যা সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক খবর।

 

- আল জাজিরা