মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নাটকীয় ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে ইরানের মদতপুষ্ট ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি।
শুক্রবার লোহিত সাগরের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ময়উন দ্বীপ, যা আন্তর্জাতিকভাবে পেরিম দ্বীপ নামেও সমধিক পরিচিত, পুরোপুরি দখল করার মধ্য দিয়ে তারা এই বিশাল সামুদ্রিক জলপথের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন এক বিশাল প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ। ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পঞ্চাশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জীবনীশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রণালিটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে, যার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিখ্যাত সুয়েজ খালের যাবতীয় নৌ চলাচল অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
ময়উন বা পেরিম দ্বীপটির অবস্থান ঠিক এই প্রণালির মধ্যবর্তী স্থানে হওয়ায়, যে পক্ষ এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ করবে, কার্যত পুরো জলপথটির ওপর তাদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকবে। জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম।
মধ্যপ্রাচ্যের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন তেলখনি থেকে বিশ্বব্যাপী যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত ও রপ্তানি করা হয়, তার প্রায় বারো শতাংশই এই অত্যন্ত ব্যস্ত সামুদ্রিক রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে এই জলপথ অবরুদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর একটি তাৎক্ষণিক ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের এক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্বীপটি বেদখল হওয়ার পেছনের ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, কৌশলগত কারণে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী গত বৃহস্পতিবার পেরিম বা ময়উন দ্বীপ থেকে তাদের সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। সরকারি বাহিনীর এই আকস্মিক প্রত্যাহারের সুযোগে সশস্ত্র হুথি যোদ্ধাদের বহনকারী বেশ কয়েকটি দ্রুতগামী নৌযান অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে ওই দ্বীপে এসে পৌঁছায় এবং বিনা বাধায় দ্বীপটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বিপুলসংখ্যক হুথি যোদ্ধা বর্তমানে বাব আল-মান্দেব প্রণালির সমগ্র উপকূলজুড়ে সতর্ক অবস্থায় মোতায়েন রয়েছে এবং তারা সামরিক যুদ্ধযানে করে ওই এলাকায় ক্রমাগত টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।
এই কৌশলগত বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস। গত সপ্তাহ থেকেই বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হুথি যোদ্ধারা এক সর্বাত্মক ও তীব্র আক্রমণ শুরু করে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষের মধ্যকার এই ভয়াবহ সামরিক সংঘাতে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকশ সাধারণ মানুষ ও যোদ্ধার প্রাণহানি ঘটেছে। যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার নিরপরাধ পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, যা ওই এলাকায় এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইয়েমেনের এই ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট নিয়ে বারবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সংঘাত থামার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক সমীকরণে হুথিদের এই সামরিক সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর চরম ক্ষুব্ধ তেহরান প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিকল্প ও নিরাপদ পথ হিসেবে লোহিত সাগরের এই বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি নৌ চলাচলের জন্য আরও বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু ময়উন দ্বীপের পতনের মাধ্যমে হুথিরা যখন এই বিকল্প ও অতি গুরুত্বপূর্ণ রুটটিরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলোর জন্য এই পথ দিয়ে চলাচল করার ঝুঁকি ও শঙ্কা এক অভাবনীয় ও বিপজ্জনক মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে।
এএফপি এবং ফ্রান্স ২৪-এর মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ এই সংঘাত এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
হরমুজ প্রণালির পর বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুটি সামুদ্রিক পথ একই সঙ্গে অচল বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।
এমতাবস্থায়, আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য লোহিত সাগর অঞ্চলে নতুন করে কোনো বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না, সেটিই এখন বিশ্ববাসীর গভীর মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।