বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই প্রণালিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক চালকবিহীন গুপ্তচর জাহাজকে সফলভাবে আঘাত করার পর ইরানের পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ও সামরিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে পার্সটুডে তাদের এক বিস্তারিত ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালিতে বিনা অনুমতিতে অনুপ্রবেশ করা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওই চালকবিহীন গুপ্তচর জলযানটির ওপর আকস্মিক ও সুনির্দিষ্ট আঘাত হানে আইআরজিসির চৌকস নৌবাহিনী।
আক্রান্ত নৌযানটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক ‘সিলড্রোন’ বা সামুদ্রিক ড্রোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার গায়ে ৫৮৩৮ নম্বর হাল বা শনাক্তকরণ নম্বর স্পষ্টভাবে অঙ্কিত ছিল। রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী আজমায়ী এই সামরিক পদক্ষেপের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের নিজস্ব জলসীমা এবং এর নিকটবর্তী স্পর্শকাতর এলাকায় শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের গোয়েন্দা নজরদারি বা সন্দেহজনক উপস্থিতিকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের এ ধরনের উসকানিমূলক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে অনতিবিলম্বে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেন।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে গিয়ে আইআরজিসির এই শীর্ষ নৌ কমান্ডার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, এই আন্তর্জাতিক জলপথটি বর্তমানে কার্যত বন্ধ রয়েছে এবং তা সম্পূর্ণভাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারি, নিবিড় তত্ত্বাবধান ও নিরঙ্কুশ সামরিক নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত।
তার এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জীবনীশক্তি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
প্রতিদিন বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এই সংকীর্ণ ও কৌশলগত জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে তা মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম, যার মাশুল গুনতে হবে সমগ্র বিশ্বকে।
সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চালকবিহীন গুপ্তচর জলযান বা সিলড্রোনের ওপর হামলার এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্নায়ুযুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনারই এক নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায়।
সিলড্রোনগুলো মূলত সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তি চালিত অত্যাধুনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি, যা মাসের পর মাস সমুদ্রে অবস্থান করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্সরের মাধ্যমে নৌচলাচল ও সামরিক ঘাঁটির তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় গোয়েন্দা নজরদারি ও সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে, যা ইরান নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক গোপনীয়তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
এর পাল্টা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নৌবাহিনীর টহল, রাডার নজরদারি ও সামরিক মহড়া বহুগুণ জোরদার করেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, চালকবিহীন নৌযানের ব্যবহার এবং এর ওপর আক্রমণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আইনি বিতর্ক থাকলেও, ইরান বারবার জোর দিয়ে বলে আসছে যে তাদের নিজস্ব পানিসীমার কাছাকাছি যেকোনো ধরনের বিদেশি নজরদারি কার্যক্রম তাদের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গত কয়েক মাস ধরে এই প্রণালিতে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের ওপর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে বিশ্বের বড় বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই তাদের জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তন বা নিরাপত্তা প্রটোকল বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।
এর ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার আহ্বান জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইআরজিসির এই সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী আজমায়ীর এই কড়া হুঁশিয়ারি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর প্রতি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অনড় অবস্থানের এক সুস্পষ্ট বার্তা।
ভবিষ্যতের দিনগুলোতে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলে সামরিক সংঘাত এড়াতে আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালির এই ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর নিরাপত্তা কাঠামোকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ, অকল্পনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে।