শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ট্রাম্প, নিজেদের ভূমিকাকে ‘অসাধারণ’ বলে দাবি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ট্রাম্প, নিজেদের ভূমিকাকে ‘অসাধারণ’ বলে দাবি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল গাজায় চলমান প্রলয়ংকরী সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট চরম মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যখন গভীর উদ্বেগ রয়েছে, ঠিক সেই স্পর্শকাতর সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ইস্যুতে নিজের প্রশাসনের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

 

সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে আয়োজিত এক বহুল আলোচিত সংবাদ সম্মেলনে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রচেষ্টাকে ‘অসাধারণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানকে বিশ্বের অনেক দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা যখন ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তার জোরালো অভিযোগ তুলছে, তখন ট্রাম্পের এমন চরম আত্মতুষ্টিমূলক মন্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন করে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে অত্যন্ত সফল বলে দাবি করে গাজার বর্তমান অবস্থাকে পুরোপুরি শান্ত ও স্থিতিশীল বলে অভিহিত করেছেন।

 

আয়ারল্যান্ডে উপস্থিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গাজা ইস্যুতে তাঁর সরকারের সফলতার একটি নিজস্ব চিত্র তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক যখন গাজায় ইসরায়েলের পরিচালিত গণহত্যামূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ সহায়তার বিষয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন, তখন ট্রাম্প সেই গুরুতর অভিযোগটি অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে কেবল নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান বর্ণনা করতে শুরু করেন।

 

তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, গাজার কথা যখন বলা হয়, তখন সবার এটি খুব ভালোভাবে জানা উচিত যে যুক্তরাষ্ট্রই মূলত সেখানকার জ্বলে ওঠা আগুন নিভিয়েছে। সংঘাত নিরসনে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের অগ্রণী ভূমিকাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বলে দাবি করেন।

 

শুধু তা-ই নয়, গাজায় এখন আর বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত বা অস্থিতিশীলতা ঘটছে না বলেও তিনি বিস্ময়কর মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের মতে, সেখানে এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং কেবল তাদের জোরালো হস্তপেক্ষের কারণেই এই কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।

 

জিম্মি উদ্ধারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আবেগঘন কিন্তু পরোক্ষভাবে নিজের প্রশাসনের জন্য ব্যাপক প্রশংসাসূচক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, অবরুদ্ধ জিম্মিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সত্যিই একটি অসাধারণ ও অভাবনীয় কাজ ছিল।

 

যেসব জিম্মি সংঘাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন, তাঁদের বাবা-মায়েরাও এক পর্যায়ে জানতেন যে তাঁদের প্রাণপ্রিয় সন্তানরা হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রিয় সন্তানের মৃতদেহটি অন্তত শেষবারের মতো দেখার জন্য এবং তাদের যথাযথ মর্যাদায় সমাহিত করার জন্য ওই পরিবারগুলোর তীব্র আকুতি ছিল।

 

ট্রাম্প অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন প্রশাসন তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই নিহত জিম্মিদের প্রত্যেককেই তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এই পুরো উদ্ধার প্রক্রিয়াটিকে তিনি তাঁর মেয়াদের একটি বিশাল মানবিক অর্জন হিসেবে দেখেন।

 

একই সঙ্গে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, গাজার দিকে তাকালে এখন সহজেই দেখা যাবে যে সেখানে অনেক ভালো ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত চমৎকার উল্লেখ করে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, তাঁর প্রশাসন এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সত্যিই একটি দারুণ কাজ সম্পন্ন করেছে।

 

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আশাব্যঞ্জক রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত ও রক্তাক্ত বাস্তবতার এক যোজন যোজন ফারাক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

 

সংঘাতের প্রকৃত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় আনুষ্ঠানিকভাবে একটি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও, বাস্তবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন ও বিমান হামলা কখনোই পুরোপুরি থেমে থাকেনি।

 

বরং যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজার বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে হত্যা ও রক্তপাতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে এখন পর্যন্ত নতুন করে অন্তত আরও এক হাজার তিনশো চৌত্রিশ জন নিরপরাধ ফিলিস্তিনি বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।

 

এছাড়া ঠিক একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম গোলাবর্ষণে আহত হয়েছেন আরও অন্তত চার হাজার চারশো উনত্রিশ জন মানুষ। গাজার হাসপাতালগুলোর মর্গ এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রতিদিন কেবল লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘সবকিছু শান্ত’ দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শুরু থেকেই অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ও দ্বিমুখী। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে শান্তি প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তার কথা বলছে, অন্যদিকে প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে অব্যাহতভাবে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, রাজনৈতিক আশ্রয় ও সামরিক সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে।

 

আয়ারল্যান্ডে ট্রাম্পের এই মন্তব্য ঠিক এমন এক সময়ে এল, যখন গাজার লাখ লাখ সাধারণ মানুষ চরম খাদ্যসংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, বাসস্থানের তীব্র সংকট এবং প্রতিনিয়ত আকাশ থেকে নেমে আসা বোমা হামলার ভয়ংকর আতঙ্কে মানবেতর দিনাতিপাত করছে।

 

যেখানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত থেকে শুরু করে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থা গাজায় সম্ভাব্য গণহত্যার বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে, সেখানে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আত্মপ্রশংসা ও বাস্তবতাবিবর্জিত মন্তব্য বিশ্ব কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক ও নৈতিক অবস্থানকে আরও চরমভাবে দুর্বল করেছে।

 

সমালোচকরা মনে করছেন, গাজায় নিরীহ মানুষের লাশের সারি এবং মানবিক বিপর্যয়ের এই চরম বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক অর্জনকে বড় করে দেখানোর এই আগ্রাসী প্রবণতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে চিরতরে অবরুদ্ধ করে তুলবে।

 

- আল জাজিরা