মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়নের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে, ইরানের অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত ও প্রভাবশালী বিশেষ সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির একটি বিশাল ও চৌকস বহর বর্তমানে ইয়েমেনের সংঘাতময় ভূখণ্ডে সক্রিয়ভাবে অবস্থান করছে।
সেখানে তারা স্থানীয় হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক অভিযানগুলোতে কেবল পরামর্শই দিচ্ছে না, বরং সরাসরি মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অত্যাধুনিক ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করছে।
এই আকস্মিক ও সুপরিকল্পিত সামরিক পদক্ষেপের ফলে লোহিত সাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে এক নতুন মাত্রার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও তীব্র বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথি বিদ্রোহীদের টানা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক কৌশলগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে।
দীর্ঘ ও তীব্র লড়াইয়ের পর সরকারি বাহিনীর চরম প্রতিরোধের মুখেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মোখা’ সমুদ্রবন্দরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা।
এই মোখা বন্দরটির ভৌগোলিক অবস্থান বাব-এল-মান্দেব প্রণালির একেবারে সন্নিকটে হওয়ার কারণে এর সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। এর ফলে পুরো সামুদ্রিক পথটি এখন কার্যত হুথি বিদ্রোহী ও তাদের নেপথ্যে সহায়তাকারী ইরানি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতির নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে জাতিসংঘ বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এখন একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, জটিল ও অস্থিতিশীল মোড় নিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, এটি কেবল ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন এমনিতেই এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ ও ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আগে থেকেই মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত ও প্রায় থমকে আছে।
এর ওপর লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বাব-এল-মান্দেব প্রণালিটিও যদি চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে পুরোপুরি বন্ধ বা অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে তা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহের ওপর এক মারাত্মক ও বিধ্বংসী জোড়া ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হবে।
অর্থনীতিবিদ ও নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী পণ্যবাহী ও জ্বালানিবাহী হাজার হাজার বিশাল আকৃতির বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়ে সুয়েজ খালের অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ নৌপথ ছেড়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশের উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে।
এই বিকল্প ও দীর্ঘ সামুদ্রিক পথ ব্যবহারের ফলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের যাতায়াতের সময় যেমন কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, তেমনি জ্বালানি খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ার কারণে সামগ্রিক পরিবহন খরচও আকাশচুম্বী হবে।
এর অনিবার্য ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী সাধারণ ভোক্তাদের ওপর, যার ফলে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করতে পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় ধস নামতে পারে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরান বরাবরের মতো এবারও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে তাদের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা বা হুথিদের প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করার সমস্ত অভিযোগ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করে আসছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, ইয়েমেনের জনগণের প্রতি তাদের সমর্থন কেবল রাজনৈতিক ও নৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইরানের এই আনুষ্ঠানিক অস্বীকার সত্ত্বেও, ইয়েমেনের মাঠপর্যায়ে ইরানি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের এবং বিশেষ করে আইআরজিসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সক্রিয় উপস্থিতির একাধিক অকাট্য ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল ও মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে আসতে শুরু করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি আন্তর্জাতিক নৌপথ-হরমুজ প্রণালি এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালি-প্রায় একই সঙ্গে অচল বা অনিরাপদ হয়ে পড়ার এই জোরালো আশঙ্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই তীব্র অস্থিরতা ও আতঙ্ক শুরু হয়ে গেছে।
এর তাৎক্ষণিক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে এক বিশাল উল্লম্ফন দেখা গেছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের শঙ্কার কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ব্যারেলপ্রতি একশত সাত ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুত্থানের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেওয়া না গেলে এই বহুমুখী সংকট বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা জোরালো সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন।