শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইএইএ-এর রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক নীতি দেশগুলোকে এনপিটি ত্যাগে বাধ্য করবে: ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম

আইএইএ-এর রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক নীতি দেশগুলোকে এনপিটি ত্যাগে বাধ্য করবে: ইরান
ছবি : File Photo

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান, দ্বৈত নীতি ও প্রকাশ্য পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে বিশ্বের বহু দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হতে পারে বলে এক অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান।

 

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এবং প্রভাবশালী সামরিক ব্যক্তিত্ব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি এই গুরুতর সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি যখন এক চরম সংবেদনশীল ও অস্থিতিশীল পর্যায় অতিক্রম করছে, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের এই নীতি-নির্ধারণী বিবৃতি বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পার্সটুডের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত ভার্চুয়াল পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ ও সুনির্দিষ্ট বিবৃতিতে এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।

 

তিনি তার বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বোর্ড অব গভর্নরসের পক্ষ থেকে যে নিন্দাসূচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তা আগাগোড়া সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

 

তার মতে, একটি স্বাধীন ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএইএ-এর এই সিদ্ধান্তের বিন্দুমাত্র কোনো আইনি বৈধতা বা প্রযুক্তিগত ভিত্তি নেই। বরং এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি মূলত আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের ক্রমাগত অবৈধ চাপ প্রয়োগের একটি নগ্ন ও হতাশাজনক বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

 

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এক ধরনের আস্থার চরম সংকট, অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিরন্তর কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিরাজমান। তেহরান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাবরই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করা হয়ে আসছে যে, তাদের যাবতীয় পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তা কেবল জাতীয় বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো, কৃষির আধুনিকায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো একান্ত বেসামরিক কাজে ব্যবহারের মহান উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

 

ইরান এনপিটি চুক্তির একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সদস্য হিসেবে আইএইএ-এর পরিদর্শকদের নিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগও প্রদান করে আসছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইরানের ওপর ক্রমাগত চাপ ও ভিত্তিহীন অভিযোগ সৃষ্টি করে চলেছে।

 

মোহসেন রেজায়ির এই সাম্প্রতিক মন্তব্য মূলত সেই দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধেই এক তীব্র প্রতিক্রিয়া। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি মূলত বৈশ্বিক পারমাণবিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

 

১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই হলো বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধ করা এবং এর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে সদস্য দেশগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে উৎসাহিত করা।

 

কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের এই সতর্কবার্তার মূল সুর হলো, আইএইএ যদি একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রযুক্তিগত নজরদারি সংস্থা হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে, তবে এই চুক্তির প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ন্যূনতম আস্থা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

 

যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ অনেক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র তাদের জাতীয় নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে এই বৈশ্বিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো এক চরম ও অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা বিশ্বে এক নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ভূমিকার প্রতি যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত করেছেন, তা বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে প্রায়শই এই গুরুতর অভিযোগ ওঠে যে, ইসরায়েল নিজে এনপিটি চুক্তিতে আজ পর্যন্ত স্বাক্ষর না করে এবং নিজেদের মজুতকৃত অঘোষিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে আন্তর্জাতিক নজরদারির সম্পূর্ণ বাইরে রেখেও অত্যন্ত সুকৌশলে আইএইএ-এর মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে কলকাঠি নাড়ছে।

 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই চরম দ্বৈত নীতির প্রতি অন্ধ ও শর্তহীন পূর্ণ সমর্থন জোগাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

 

ইরানের সুস্পষ্ট দাবি হলো, আইএইএ-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার উচিত কোনো পরাশক্তির চাপে মাথা নত না করে বিশ্বের সকল দেশের জন্য এক, অভিন্ন ও নিরপেক্ষ আইনি নীতি অনুসরণ করা।

 

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ির এই সর্বশেষ হুঁশিয়ারি কেবল ইরানের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ নয়, বরং এটি সমগ্র বৈশ্বিক পারমাণবিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বিশাল ও ভয়াবহ অশনিসংকেত।

 

আইএইএ-এর বোর্ড অব গভর্নরসের এই বিতর্কিত ও একতরফা প্রস্তাব এবং তার বিপরীতে ইরানের এই আপসহীন ও কঠোর অবস্থান যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ভঙ্গুর নিরাপত্তা কাঠামোকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও শান্তিকামী মহল মনে করছেন, জাতিসংঘের অধিভুক্ত এই সংস্থাটির কার্যক্রমে যদি খুব দ্রুত নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা না হয়, তবে এনপিটি-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী আন্তর্জাতিক চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা এক বিশাল প্রশ্নের সম্মুখীন হবে এবং বিশ্ব এক অনিশ্চিত পারমাণবিক ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।

 

- পার্সটুডে